ইসলামী আন্দোলন! শব্দ দু’টি খুব মৌখিক ও লৌকিকভাবে খুব একটা পছন্দ করতে পারতাম না; কিন্তু অন্তরে অন্তরে একটা টান অনুভব করতাম সেই ছোট্টবেলা থেকে। ব্যাপারটা কয়েকবার টের পেয়েছি।

১.
তখন প্রতিটি বিকেল ছিল ভলিবল, ক্রিকেট, গোল্লাছুট, ব্যাটমিন্টন খেলার তুমুল হৈহুল্লোড়ে ঊশৃংখল এবং দাবা খেলার কৃত্রিম ভাবনায় গুরুগম্ভীর। বিকেল বেলায় মনেই থাকতো না যে, আমি একজন মুসলমান। তখন মুনীরকে দেখতাম এমন মহা আনন্দময় সময়ে সব ফেলে মসজিদের পানে যাচ্ছে; কেননা তার আসরের নামাজ পড়া লাগবে। একটু আশ্চর্য হয়েই তাকাতাম তার দিকে, সেই রেশ না পুরাতেই শুনতে পেতাম আমার প্রতিও তার নামাযের আহ্বান। মনটা হঠাৎই একটু ধার্মিক হয়ে উঠতো, তারপর বন্ধুদের হুল্লোড় আর মুনীরের প্রতি ছুঁড়ে দেয়া নানা ঠাট্টার সাথে সাথে বদলে যেতাম আমিও এবং ওদের সাথে সুর মিলিয়ে তখন আমিও বলে বসতাম- “ও, তুই তো আবার শিবির করিস্”।

২.
ছিমছাম লম্বা যুবকটি আমার বেশ ক’বছরের সিনিয়র। রীতিমত কলেজে পড়ে। শারিরিক গঠনের কারণে হোক কিংবা স্বভাব; তিনি বরাবরই শান্ত শিষ্ট ভদ্রলোক সেজে থাকতেন। কোন প্রকার হৈচৈয়ে নেই। একদিন পথের ধারের পুকুর পাড়ে ডেকে বসালেন। আল্লাহ্, তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম, ইসলাম, ইসলামী আন্দোলন ইত্যাদি বিষয়ে হালকা হালকা কিছু ধারণা দিতে চেষ্টা করলেন এবং একটি বই পড়ার প্রস্তাব করলেন। মনে পড়ে, বইটির নাম ছিল ‘ইসলামের হাকীকত’। বইটি দিলেন, বাড়ীতে গিয়ে টেবিলে রেখে দিলাম। তারপর ভুলেই গেলাম যে, কেউ আমাকে একটি বই পড়তে দিয়েছে। বেশ কিছুদিন পর ফেরৎ চাইলেন আর আমিও ফেরৎ দিয়ে দিলাম। আজকাল বইটি পড়ার পর বাংলাদেশের জনপ্রিয় ক’জন আলেমের মত মন্তব্য করতে না পারলেও তাদের কথাগুলো অন্তরে কেবলি বাজে- ‘এত এত পড়াশোনা করলাম, কিন্তু ইসলামকে এভাবে বুঝতে পারিনি যেভাবে সাইয়েদ আবুল ‘আলা মওদূদী রাহিমাহুল্লাহ্ হাকীকত সিরিজের বইগুলোতে বুঝিয়েছেন’।

৩.
এসএসসি পরীক্ষার তখনো এক বছর বাকী, তবে কেন্দ্রে গিয়েছি ঠিকই; পরীক্ষা দেখতে। কি আর দেখা, দিঘীর ওপারে কেন্দ্র আর আমরা দল বেঁধে স্বজন ও উৎসাহীরা এপারে বসে তিন ঘন্টা মিনিট মিনিট করে গুনছি। শুনে আসছিলাম ক’দিন থেকেই নাকি পাশ্ববর্তী কলেজে শিবির ও ছাত্রলীগের মধ্যে বিরাজ করছে উষ্ণ সম্পর্ক, ছাত্রদলও নাকি নিরব সমর্থন দিচ্ছে লীগকে। তারপর সেদিন কথা নেই বলা নেই হঠাৎই কানে এলো মিছিলের শব্দ- “লড়াই লড়াই লড়াই চাই! লড়াই করে বাঁচতে চাই!! বিপ্লব বিপ্লব! ইসলামী বিপ্লব!! আল্লাহর আইন চাই! সৎলোকের শাসন চাই!!” ইত্যাদি। ক্ষণকাল পর আরেকদল ছাত্র (লীগ ও দল) ইট পাটকেল নিয়ে হানা দিল মিছিলের পেছন থেকে। এ যেন প্রতারকদের যুদ্ধ জয়ের অপকৌশল। খালি হাতের মিছিলকারীরা নিজেদেরকে ইটের মণ্ডপে বলী দেয়া থেকে বাঁচানোর জন্য যে যেদিকে পারলো ছুটে গিয়ে নিরাপদ আশ্রয় খুঁজে নিল। একটি ছেলে লাফ দিয়ে কেন্দ্র তথা স্কুলের বাউন্ডারীর ভেতর ঢুকে দেয়ালের সাথে সেঁটে থাকল। হানাদার ছাত্ররা দেয়াল টপকিয়ে উঠতে চাইল ছেলেটাকে মারার জন্য, স্কুলের প্রধান শিক্ষক তাদেরকে ঢুকতে না দেয়ায় রক্ষা পেল ছেলেটি। ঘটনাটি দেখার পর থেকে ছোট্ট মনে নানা ভাবনার উদয় হতে লাগল। শুনেছি যে মুসলমানদের এদেশেও ইসলামের বিরুদ্ধে কথা বলার মত অনেক লোক আছে, তাদের নামও মুসলমানী ঢঙে। কিন্তু ইসলামকে জীবনের সর্বক্ষেত্রে চাওয়ার অপরাধে মার খেতে হয় বাংলাদেশের মত মুসলিম দেশেও; সেই প্রথম দেখা হল। জানিনা কেন, কোনভাবেই মনে নিতে পারলাম না পেছন থেকে এসে কাপুরুষের মত হামলা করা লীগ ও দলের ছাত্রদের এহেন আচরণ। তবে আপাততঃ ঝোঁকের বশে শব্দ করেই মনকে বুঝালাম- “ধুর, ওরা হল শিবির, রগকাটার দল, রাজাকার, উপরে উপরে ভাল ভেতরে দুষ্ট” ইত্যাদি প্রবোধে।

৪.
জীবনের প্রথম সনদপত্র প্রাপ্তির জন্য পরীক্ষা, গ্রামের স্কুলে পড়াশোনা করতাম, কেন্দ্র বহুদূর, গাড়ীচড়া পথের দূরত্ব। আমাদের মত ছাত্রছাত্রীরা কেন্দ্রের চারপাশের কোন আত্মীয়ের বাড়ী কিংবা স্থানীয়দের বাড়ীতে অনুরোধ করে আশ্রয় নেয় পরীক্ষার দিনগুলোর জন্য। তেমনিভাবে আমিও নিলাম, কেন্দ্র না হলেও কলেজের পাশাপাশি একটা বাড়ীতে আমার স্থান হল। সেদিন বিকেল বেলা ক’জন বন্ধুর সাথে বেরুলাম অগ্রহায়নের সদ্য জাগা সবুজ মাখা বিকেলের বাতাস খেতে। পথটি ছিল মাঠের মাঝে, দু’পাশে নতুন সবুজ ধান গাছ। চলতে চলতে স্থানীয় একটি ছেলের সাথে দেখা, বেশ সিনিয়র; দেখেই বুঝে নিলাম। স্বেচ্ছায় আলাপ জমালেন, তারপর বসা হয়ে গেল সবুজ ঘাসের মাদুরে এবং চলতে থাকল আলাপ চারিতা তখনো যখন সন্ধ্যা নামে। নানাভাবে ইসলাম ও ইসলামী আন্দোলনের দাওয়াত পেশ করলেন তিনি। কেউ বুঝেছি, কেউ বুঝিনি, কেউ উসখুস করেছি পালানোর ভাবনায় ইত্যাদি। কিন্তু মনের গভীরে কোথায় যেন আটকে গেছিল যুবকের কথাগুলো। যেন মন থেকে কেউ বলছে- ‘তুমি মুসলমান, ইসলামকে শুধু নামে চিনলেই হবে না, চিন্তা-বিশ্বাস-কর্মে চিনতে হবে তোমাকে’।

আজ ইসলাম আমার কাছে ধরা দিয়েছে তার স্বমহিমায়। আর আমাকে করেছে মহিমান্বিত যমীনে ও আকাশে। তবে আমি নিশ্চিত, যমীনে এর ধরন অনেক কঠিন, কঠোর, দুর্গম এবং আকাশে অনন্ত শান্তির….। প্রার্থনা শুধু এই, শেষ দিন পর্যন্ত আমি যেন আল্লাহর বান্দা থাকতে পারি নিজের পক্ষ থেকে ও আল্লাহর পক্ষ থেকে।

১৬ নভেম্বর ২০০৯, মদীনা মুনাওয়ারা, সউদী আরব।

Share