মানুষের সহজাত প্রবৃত্তির একটি অংশ হলো সে অন্যের উপর নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে চায়। এর জন্য ক্ষেত্র নির্ধারিত হয় অবস্থা ও বাস্তবতার ভিত্তিতে। সাধারণ ভাবে তো প্রত্যেক মানুষই তার নিজের ব্যাপারে কর্তৃত্বশীল, এর বাইরেও রয়েছে অসংখ্য পর্যায় যেগুলোতে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা পায়। পরিবারের উপর বাবা, মা বা বড় ভাই-বোন কর্তৃত্ব করে-যেগুলো প্রাকৃতিক নিয়েমই প্রতিষ্ঠিত হয় সাধারণতঃ। এছাড়া কর্মক্ষেত্রে নানা স্তরে নানা কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত, সমাজে সমাজপতির কর্তৃত্ব, দেশে শাসকের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। জগতের সাধারণ নিয়মে যদি সবকিছু ঘটতো, তবে তো আপত্তির কোন কারণ ছিল না। কিন্তু বিপত্তি ঘটে তখনি যখন হাজারো অযোগ্যতা সত্ত্বেও নিজেকে কোন কর্তৃত্বের জন্য পেশ করা হয়, প্রচেষ্টা চালানো হয়, এমনকি বল প্রয়োগও করা হয়।
মূলতঃ কর্তৃত্ব, ক্ষমতা, দায়িত্ব ইত্যাদি বিষয়গুলোর অন্তরালের কলকাঠি তো নাড়েন বিশ্ব প্রতিপালক নিজেই। মানুষের হাতে এ ব্যাপারে রয়েছে কিছু কাজ, কিছু প্রচেষ্টা চালানোর প্রয়াস কিংবা অন্যায়ভাবে জবরদখলের মত যুলুমের সুযোগ। জ্ঞানবানদের জন্য বুঝা খুবই সহজ যে, এখানে উল্লেখিত ‘কিছু কাজ’টাই সঠিক পন্থা হতে পারে, বাকী ‘প্রচেষ্টার প্রয়াস’ ও ‘জবরদখল’-এর বিষয়গুলো কখনো সরাসরি অন্যায়, কখনোবা নৈতিকতার জন্য চরম বিপদজনক।
কর্তৃত্ব বা ক্ষমতা বন্টনের জন্য কাজগুলো কি হতে পারে সে বিস্তারনে যাবার আগে ইসলামের নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের একটি বাণী বিশেষ প্রনিধান যোগ্য, যা ইবনে উমার রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমার বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন: “আমি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি: তোমাদের প্রত্যেকেই রক্ষণাবেক্ষণকারী(বা দায়িত্বশীল) এবং তোমাদের প্রত্যেকেই তার অধীনস্থদের রক্ষণাবেক্ষণ সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। পুরুষ তার পরিবার ও সংসারের জন্য দায়িত্বশীল এবং তাকে তার রক্ষণাবেক্ষণ ও দায়িত্বপালন সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। স্ত্রীলোক তার স্বামীর ঘরের রক্ষণাবেক্ষণকারিনী এবং তাকে সে সম্পর্কে জবাবদিহি করতে হবে। খাদেম তার মনিবের সম্পদের রক্ষণাবেক্ষণকারী এবং তাকে তার সে দায়িত্বপালন সম্পর্কে জবাবদিহি করতে হবে। অতএব তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেককে নিজ নিজ দায়িত্ব পালন সম্পর্কে জবাবদিহি করতে হবে।” [বুখারী ও মুসলিম]
মানবজাতির সামাজিক কাঠামোর সর্বনিম্ন বা সাধারণ যে স্তর তা হলো পরিবার। প্রিয় রাসূল উপরোল্লেখিত হাদীসে সাধারণভাবে নিজ নিজ দায়িত্ব সম্পর্কে জবাবদিহিতার সংবাদ ও ভয় প্রদর্শনের মাধ্যমে দায়িত্ব-কর্তৃত্ব-রক্ষণাবেক্ষণের ব্যাপারে সতর্ক করতে গিয়ে যে উদাহরণ পেশ করেছেন, তার প্রথমটি ছিল এই পরিবার কেন্দ্রিক। কেননা, যে সুষ্ঠু ও সঠিকভাবে সদস্যদের প্রত্যেকের হক যথাযথভাবে আদায় করে তার পরিবারকেপরিচালনা করতে সক্ষম হবে, তাকে অন্য কোন দায়িত্বের জন্য নির্বাচিত করার ব্যাপারে চিন্তা করা যেতে পারে। তবে অবশ্যই আরো অন্যান্য বহু গুণ-বৈশিষ্ট্য লক্ষণীয় হবে। এবং তারপর তিনি (সা) অর্থ-সম্পদের দিকটির প্রতি ইঙ্গিত করেছেন। কারণ, এ বিষয়ে মানব জাতির অধিকাংশই খুব অল্পতেই সরল পথ থেকে পিছলে যায়।
দায়িত্ব দান বা কর্তৃত্বের অধিকার প্রদানের ক্ষেত্রে একচ্ছত্র ক্ষমতা রাখেন কেবলমাত্র এ বিশ্বজাহানের প্রতিপালক। তিনি তাঁর বাণীতে বলেন:
قُلِ اللَّهُمَّ مَالِكَ الْمُلْكِ تُؤْتِي الْمُلْكَ مَن تَشَاء وَتَنزِعُ الْمُلْكَ مِمَّن تَشَاء وَتُعِزُّ مَن تَشَاء وَتُذِلُّ مَن تَشَاء بِيَدِكَ الْخَيْرُ إِنَّكَ عَلَىَ كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ. – سورة آل عمران 26
“বলুন,হে আল্লাহ্! দেশের মালিক! আপনি যাকে ইচ্ছা তাকে রাজ্য দিয়ে থাকেন এবং যার কাছ থেকে ইচ্ছা রাজ্য ছিনিয়ে নিয়ে থাকেন এবং যাকে চান তাকে সম্মান এবং যাকে চান লাঞ্ছনা দিয়ে থাকেন। আপনারই হাতে রয়েছে সব মঙ্গল। আপনিই নিঃসন্দেহে সব কিছু করার ক্ষমতা রাখেন।” [সূরা আলে ইমরানঃ ২৬]
পৃথিবীবাসী যত যাকিছু করুক না কেন, কর্তৃত্বের এ সিদ্ধান্ত নিঃসন্দেহে আকাশেই হয়ে থাকে। তাহলে আমাদের করণীয় কি? কিংবা যা কিছু আমরা ক্ষমতা-কর্তৃত্ব লাভের জন্য করে থাকি সেসব কেন?
পূর্বেই বলেছি যে, তিনটি পর্যায় রয়েছে আমাদের হাতে- দায়িত্বশীল নির্বাচনের জন্য কিছু প্রক্রিয়াগত কাজ সম্পাদন করা, দায়িত্ব পাবার জন্য নিজেই দলবল নিয়ে চেষ্টা তদবীর করা ও বল প্রয়োগের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করা।
বস্তুতঃ প্রথম পর্যায়টিই সঠিক ও কল্যাণকর। কেননা, এতে কেউই নিজেকে নিজেই দায়িত্বশীল ঘোষণা দেবে না; বরং স্বাভাবিক নিয়মে প্রাপ্ত দায়িত্বগুলো ছাড়া অন্যান্য যেসব সাধারণ দায়িত্ব রয়েছে, সেসবের ক্ষেত্রে প্রত্যেকেই প্রার্থী আবার প্রত্যেকেই এ ব্যাপারে সচেতন যে, নিজেদের মধ্য থেকেই যোগ্য ব্যক্তিকে নিজেদের জন্য দায়িত্বশীল নির্বাচিত করবো। পারস্পরিক আলোচনা, পর্যালোচনা, পরামর্শ ইত্যাদির মাধ্যমে সমাজের, অঞ্চলের এমনকি রাষ্ট্রের জন্যেও সততা, যোগ্যতা, নিষ্ঠা, ন্যায়পরায়নতা, নম্রতা, ভালবাসা ইত্যাদিতে সর্বোত্তম ব্যক্তিকে নিজেদের দায়িত্বশীল হিসেবে নির্বাচিত করাই এ পর্যায়ের মূল কাজ। প্রক্রিয়াগতভাবে বর্তমানে আমাদের সমাজ, অঞ্চল, দেশ ইত্যাদি পর্যায়ে এখনো এমন লোক রয়েছেন যারা নিজেদের জন্য এমন কর্তৃত্ব নেয়াকে অসামান্য বোঝা মনে করেন আল্লাহর সম্মুখে দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবার ভয়ে। সেক্ষেত্রে যদি গণমানুষের কিংবা গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গের আবেদনে অথবা সত্য-মিথ্যার পক্ষাবলম্বনের কারণে প্রার্থীতা নিতে বাধ্য করা হয়, তবে দায়িত্বের জন্য মনোনীত হওয়া ও সত্য প্রতিষ্ঠার জন্য সাধনা করাও এক প্রকারের দায়িত্ব পালনের অন্তর্ভুক্ত।
তারপরের পর্যায়ে ব্যক্তি তার নিজের যোগ্যতা সম্পর্কে অসচেতন কিংবা ধূর্ততা-কপটতা অবলম্বনের মাধ্যমে নিজেকে যোগ্য হিসেবে নিজেই ঘোষণা দিয়ে থাকে এবং প্রচুর পরিমাণ অর্থব্যয়ের মাধ্যমে ও নানা কৌশল খাটিয়ে নিজের পক্ষে মানুষদেরকে জড়ো করার জন্য সচেষ্ট থাকে। এজন্য সে যাবতীয় দূর্নীতি, অনিয়ম ইত্যাদি অবলীলায় করে যেতে মোটেও দ্বিধাগ্রস্ত হয় না। পরিণামে দেখা যায় যে, তার আগমন যে ধারায় ঠিক সে ধারাতেই কর্তৃত্ব পরিচালিত হয় তার দ্বারা। সেখানে শোসন, যুলুম, অন্যায়, অবিচার, নির্যাতন, ঘুষ, সুদ, ধর্ষন, হত্যা ইত্যাদি কোন কিছুরই অভাব থাকে না, অভাব থাকে কেবলমাত্র একটি জিনিসের, তা হলো- ন্যায়পরায়নতা।
তৃতীয় যে পর্যায়ে মানুষেরা মানুষের উপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে থাকে, তা হলো- বল প্রয়োগের মাধ্যমে। অতীত কালের মত যুদ্ধ-বিগ্রহ ছাড়াও আধুনিক যুগে রক্ষকদের ভক্ষক হবার মত একটা কৌশল কার্যকর। দেশ ও দেশের সুরক্ষায় যাদেরকে নিয়োজিত রাখা হয়, তারাই কখনো কখনো ক্ষমতার লোভে লোভাতুর হয়ে দখল করে নেয় কর্তৃত্বের আসন। তারপর তা বিস্তারিত হয় অঞ্চলে, সমাজে। অবশ্য কখনো কখনো এ ধরনের ক্ষমতায়নের প্রয়োজনও হয়ে পড়ে। মোটকথা, এ ক্ষেত্রে ব্যক্তির গুণ-বৈশিষ্ট্যের উপরই নির্ভর করে তার দায়িত্বপালনের অনুভূতি, রকমসকম ও জবাবদিহিতামূলক শাসন প্রতিষ্ঠার বিষয়গুলো।
প্রথম, দ্বিতীয় বা তৃতীয়; যেভাবেই দায়িত্বপ্রাপ্তির প্রচেষ্টা চলুক না কেন, তার ফলাফল আকাশেই নির্ধারিত হয়। তাই স্রষ্টাপ্রদত্ত দায়িত্ব পেয়ে যদি কেউ তার যথাযথ পালনের ক্ষেত্রে প্রতারণার আশ্রয় নেয়, তবে তার ভয়াবহ পরিণাম সম্পর্কে প্রিয় রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীস-
আবূ ইয়ালা মাকিল ইবনে ইয়াসার রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি: আল্লাহ্ তাঁর কোন বান্দাকে প্রজাসাধারণের তত্ত্বাবধায়ক বানাবার পর সে যদি তাদের সাথে প্রতারণা করে থাকে, তবে সে যেদিনই মৃত্যুবরণ করুক, আল্লাহ্ তার জন্য জান্নাত হারাম করে দিবেন।
[ইমাম বুখারী ও ইমাম মুসলিম হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। অন্য এক বর্ণনায় এসেছে: সেই ব্যক্তি যদি তার প্রজাদের কল্যাণ সাধনে আত্মনিয়োগ না করে, তাহলে সে জান্নাতের সুবাসটুকুও পাবে না। মুসলিমের এক বর্ণনায় আছে: যে শাসক মুসলমানদের যাবতীয় বিষয়ের তত্ত্বাবধায়ক নিযুক্ত হয়; তারপর তাদের উপকারের জন্য কোনরূপ চেষ্টা-যত্ন করে না এবং তাদের কল্যাণ সাধনে এগিয়ে আসে না, সে মুসলমানদের সাথে কখনো জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না।]
অতএব, দায়িত্ব-কর্তৃত্ব যদি অনিচ্ছা সত্ত্বেও গণমানুষের পক্ষ হতে আল্লাহ্ অর্পণ করেন, তবে তা অবশ্যই অনন্য পাওনা; সে ব্যাপারে দ্বিমত নেই। পরন্তু পাওনাতেই শেষ নয়; বরং দায়িত্বের ব্যাপারে যথাযথ কার্যক্রম সঠিক ও সুষ্ঠুভাবে সম্পাদনের মধ্যেই নিহিত রয়েছে সফলতা। অন্যথা “জান্নাত হারাম” হবার মত ভয়াবহ পরিণামের ভয় প্রদর্শিত হয়েছে এ ব্যাপারে। পক্ষান্তরে যারা স্বেচ্ছায় দায়িত্বের জন্য নিজেদের পেশ করে থাকে আদৌ সে দায়িত্ব পালনের যোগ্য কি না তা না ভেবেই এবং প্রাপ্তির জন্য হেন দুষ্কর্ম নেই যা করে না বা করতে প্রস্তুত হয়ে নেই, এমনকি মানুষ হত্যাও, তাদের দ্বারা কি দায়িত্ব পালিত হবে এবং হচ্ছে তার সাক্ষী যুগে যুগে ইতিহাস। তাদের পরিণাম সম্পর্কে জ্ঞানীরাই ভীত সন্ত্রস্ত হন; অথচ তারা কি নিশ্চিন্ত বেখবর। যদি তারা জানতো…।

২৯ নভেম্বর ২০০৮, মদীনা মুনাওয়ারা, সউদী আরব।

Share