বিস্মিল্লাহির রহমানির রহীম
১. ইসলাম ও আন্দোলনঃ ইসলামী আন্দোলন
মানুষের সৃষ্টিগত বৈশিষ্ট্যই এমন যে, সে কারো না কারো কাছে তার মনের চাওয়া-পাওয়াগুলোকে তুলে ধরবেই, তার বিপদাপদে সাহায্য চাইবেই, তার শ্রদ্ধা-ভালবাসাকে কারো না কারো সামনে পেশ করবেই; চাই সে হোক তার নিজের নফ্স বা ইচ্ছা-অনিচ্ছা, কিংবা অন্য কোন মানব সত্তা, কিংবা কোন সৃষ্টি যেমন- চন্দ্র-সূর্য, তারকারাজি, সাগর, দেশমাতা ইত্যাদি, কিংবা জাগতিক কোন শক্তি যেমন- বাতাস, আগুন, পানি ইত্যাদি, কিংবা কাল্পনিক কোন সত্তা বা সৃষ্টি যেমন- কল্পনা প্রসূত কারো মূর্তি বানিয়ে কিংবা জিনদের কারো প্রতি কিংবা সর্বশক্তিমান এক ও অদ্বিতীয় বিশ্ব-জাহানের স্রষ্টা ও প্রতিপালনক আল্লাহ্ তা‘আলার প্রতি। মানুষের এই দুর্বলতার কথা তো তাঁরই সবচেয়ে বেশী জানার কথা, যিনি সৃজন করেছেন এবং প্রতিপালন করছেন মানুষকে। তারপর পর্যায়ক্রমে পাঠাচ্ছেন পৃথিবীর পথে পথে আবার তুলেও নিচ্ছেন পর্যায়ক্রমেই। তিনিই স্রষ্টা, তাই তিনি অবশ্যই জানতেন ও জানেন মানুষের অন্তরের প্রকৃতি, চাওয়া, ভক্তি-শ্রদ্ধা ইত্যাদি কোথায় কিভাবে ব্যয়িত হবে, আর সেজন্যই প্রথম মানবকে সৃষ্টি করে পৃথিবীর পথে পাঠানোর সময়ই সাথে সাথে পাঠিয়েছেন মানুষের জীবন চলার বিধি-বিধানও। আল্লাহ্ বলেনঃ
قُلْنَا اهْبِطُواْ مِنْهَا جَمِيعاً فَإِمَّا يَأْتِيَنَّكُم مِّنِّي هُدًى فَمَن تَبِعَ هُدَايَ فَلاَ خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلاَ هُمْ يَحْزَنُونَ - وَالَّذِينَ كَفَرواْ وَكَذَّبُواْ بِآيَاتِنَا أُولَـئِكَ أَصْحَابُ النَّارِ هُمْ فِيهَا خَالِدُونَ.
অর্থাৎ, “আমরা বললাম, ‘তোমরা সকলে এখান থেকে নেমে যাও। পরে যখন আমার পক্ষ থেকে তোমাদের নিকট সৎপথের কোন নির্দেশ আসবে তখন যারা আমার সৎপথের অনুসরণ করবে, তাদের কোন ভয় নেই এবং তারা দুঃখিতও হবে না। আর যারা কুফরী করে ও আমাদের নিদর্শনসমূহকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে তারাই জাহান্নামের অধিবাসী, সেখানে তারা চিরস্থায়ী হবে।” [সূরা আল-বাকারাহঃ ৩৮-৩৯] এখন আমাদের দেখার বিষয় যে, মানবজাতির স্রষ্টা আল্লাহ্ তা‘আলা যে “সৎ পথের নির্দেশ”-এর কথা উক্ত আয়াতে বলেছেন, তা কি?
ইসলামঃ পৃথিবীতে মানবতার জীবন চলার বিধানের স্রষ্টা প্রদত্ত সঠিক ইতিহাসে শুধুমাত্র ইসলামই সকল যুগে এবং সকল মানুষের জন্য একমাত্র জীবন ব্যবস্থা ছিল, আছে এবং থাকবে। কিন্তু যুগে যুগেই সময় ও স্থানের চাহিদা মোতাবেক মানব জাতির স্রষ্টা আল্লাহ্ তা‘আলা তাদের জন্য ইসলামী জীবন ব্যবস্থার যেথায় যতটুকু প্রয়োজন সেথায় ঠিক ততটুকুই পাঠিয়েছেন। তবে মূলনীতি ছিল একই, যেমনটি আল্লাহ্ বলেনঃ
وَلَقَدْ بَعَثْنَا فِي كُلِّ أُمَّةٍ رَّسُولاً أَنِ اعْبُدُواْ اللّهَ وَاجْتَنِبُواْ الطَّاغُوتَ. . .
অর্থাৎ, “আল্লাহর ‘ইবাদাত করার ও তাগূতকে বর্জন করার নির্দেশ দেয়ার জন্য আমি তো প্রত্যেক জাতির মধ্যেই রাসূল পাঠিয়েছি।” [সূরা আন্-নাহ্লঃ ৩৬] সুতরাং ইসলাম যেখান থেকে যুগে যুগে এসেছে সেই কেন্দ্র যেমন এক, তেমনি ইসলামের মৌলিক আবেদনও ছিল প্রতি যুগেই এক, পার্থক্য ছিল বিধি-বিধানসমূহের কম-বেশী হওয়া এবং সেসব পালনের পদ্ধতিসমূহে।
তাহলে প্রশ্ন জাগতে পারে যে, জগতের আর সব ধর্মের ভিত্তি কি? এর জবাব হলো- উপরেই উল্লেখ করেছি যে, মানুষ কিভাবে তার ভক্তি-শ্রদ্ধা-ভালবাসা-বিনয় ইত্যাদিকে স্বভাবজাতভাবেই অন্যকারো নিকট উপস্থাপন করতে পছন্দ করে, সেই অস্থির আর নতুনত্ব পিয়াসী মানসিকতাই মানুষকে বিভ্রান্ত করেছে আল্লাহর সত্য দ্বীন ইসলাম থেকে। তাছাড়া মানব জাতির সবচেয়ে বড় শত্র“ ইবলীসের চক্রান্ত তো পুরোপুরি কার্যকর ছিলই। তাই মানুষ সত্যকে পেয়ে কেউ তাকে গ্রহণ করেছে, কেউ সন্দেহে পতিত হয়েছে আবার কেউ প্রত্যাখ্যান করেছে; এমনটি তারা নবীদেরকে পর্যন্ত হত্যা করতে দ্বিধা করেনি। সুতরাং যারা আল্লাহর নবী হত্যার মত জঘন্য কার্যকলাপ সংঘটিত করতে পেরেছে, তাদের জন্য মোটেই কঠিন কিছু নয় যে, তারা আল্লাহর সত্য দ্বীনকে বিকৃত করে ফেলবে; যার উদাহরণ আমাদের সামনেই রয়েছে- ইয়াহূদী ও খৃস্টান জাতি। একথা বলাই বাহুল্য যে, ধারণা করা যেতে পারে যেসব ধর্ম গ্রন্থাবলীতে এখনো শেষ নবীর আগমনের ইঙ্গিত পাওয়া যায় সেসবের মূলে যে ইসলামই কার্যকর ছিল; বরং তা স্বেচ্ছাচারী মানুষদের দ্বারা বিকৃত হয়ে আজকের ভগ্নদশায় পতিত হয়েছে।
অবশেষে সব জাতির ধ্বংস কিংবা পতনের পর আল্লাহ্ তা‘আলা শেষ নবীর উম্মাত ও পৃথিবীর সর্বশেষ আসমানী গ্রন্থপ্রাপ্ত জাতি মুসলমানদেরকে পরিপূর্ণ একটি জীবন ব্যবস্থা দান প্রসঙ্গে বলেনঃ
. . . . الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ وَأَتْمَمْتُ عَلَيْكُمْ نِعْمَتِي وَرَضِيتُ لَكُمُ الإِسْلاَمَ دِيناً. . . .
অর্থাৎ, “. . . . আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পরিপূর্ণ করে দিলাম এবং তোমাদের উপর আমার নেয়ামত সম্পূর্ণ করলাম, আর তোমাদের জন্য ইসলামকে দ্বীন হিসেবে মনোনীত করলাম।. . . .” [সূরা আল-মায়েদাঃ ৩] এ থেকে পরিস্কার হলো যে, আল্লাহ্ তা‘আলা পূর্বের জাতিসমূহের কাছে যখন যেভাবে যতটুকুই জীবন চলার বিধান দিয়েছেন না কেন, শেষ নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের উম্মাতদেরকে দিয়েছেন জীবন চলার একটি পরিপূর্ণ বিধান এবং তা যে আল্লাহর পক্ষ থেকে নেয়ামত, তা যে আল্লাহর মনোনীত এবং তা যে একমাত্র ইসলাম; সেকথা উপরোক্ত আয়াতেই পরিস্ফুট হলো।
ইসলাম কি এ প্রসঙ্গে জিব্রীল ‘আলাইহিস্ সালাম কর্তৃক প্রশ্নে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিখ্যাত ‘হাদীসে জিব্রীল’-এ বলেনঃ “. . . ইসলাম হচ্ছে এই- তুমি সাক্ষ্য দেবে যে, আল্লাহ্ ছাড়া কোন ইলাহ্ (মা‘বূদ) নেই এবং মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর রাসূল, সালাত প্রতিষ্ঠিত করবে, যাকাত আদায় করবে, রমাদানের সিয়াম পালন করবে এবং যদি পথ অতিক্রম করার সামর্থ হয় তখন বায়তুল্লাহ্র হজ্জ করবে। জবাবে তিনি (জিব্রীল ‘আলাইহিস্ সালাম) বললেনঃ আপনি সত্যই বলেছেন. . . ” [সহীহ্ মুসলিমঃ কিতাবুল ঈমান, হাদীস-১] ইসলামের বিরাট ও ব্যাপক সংজ্ঞা থাকলেও এর মৌলিকত্ব উপরোক্ত আয়াত ও হাদীসের মধ্যেই নিহিত রয়েছে। আর মৌলিকত্বের দৃঢ়তা, স্থিতিশীলতা এবং সে সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান লাভ ও আচরণে তার পরিস্ফুটনের মাঝেই নিহিত রয়েছে একজন মুসলমানের সাফল্য এবং ব্যর্থতা। জীবন ব্যবস্থার বাকীসব শাখা-প্রশাখা এই মৌলিকত্বের পরে অবশ্যই।
আন্দোলনঃ এখন আসি আন্দোলনের প্রসঙ্গে, বাংলায় যার ভিন্ন প্রতিশব্দাবলীতে রয়েছে- নাড়াচাড়া, দাঁড় করানো ইত্যাদি। ইংরেজীতে গড়াবসবহঃ এবং আরবীতে حركة বলা হয়। পারিভাষিক অর্থে- কোন আদর্শ বা মতবাদকে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য যাবতীয় প্রয়োজনীয় চেষ্টা-সাধনা করা। এই চেষ্টা-সাধনায় সংজ্ঞবদ্ধতা এক বিরাট পরিপূরক। পৃথিবীর প্রতিটি আদর্শ কিংবা মতবাদই কোন একটি মাথা থেকে শুরু হয়েছে, প্রথমতঃ পাওয়া বা অর্জন, তারপর নিজ সত্তায় ধারণ, অতঃপর তা নিয়ে নাড়াচাড়া বা তাকে প্রতিষ্ঠিত করার সংকল্পে অন্যের নিকট উপস্থাপন ও নিজমতাদর্শের সাথে ঐকমত্য স্থাপনের লক্ষ্যে চেষ্টা-সাধনা করা হয়। উল্লেখ্য যে, এই চেষ্টা-সাধনার শুরুটি খুবই সৌহার্যপূর্ণ ও মিষ্টি কথার দ্বারা, তারপর মানুষ এ প্রশ্নে বিভক্ত হয় মৌলিক তিনটি ভাগে- ১) তা গ্রহণ করে নেয় নির্দ্বিধায়, ২) তা নিয়ে দ্বিধা-দ্বন্ধে পতিত হয়ে সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগে ও ৩) তা শুরুতেই প্রত্যাখ্যান করে। এ তিনটি বিভাগের বাইরেও থেকে যায় আরেকটি অংশ যারা কোন না কোনভাবে এ আহ্বান থেকে দূরে অবস্থান করছে অর্থাৎ, শুনেও প্রতিক্রিয়াহীন, শুনার চেষ্টা থেকে বিরত অথবা আদর্শ-মতবাদ ইত্যাদি বিষয়ে বরাবরই উদাসীন যারা।
তারপর বিরোধের সূত্রপাত ঘটে নির্দ্বিধায় গ্রহণকারী ও সরাসরি প্রত্যাখ্যানকারীদের মধ্যে। এসবের মধ্যে আদর্শিক দিক তো মূল ভিত্তি, অবশ্য যদি তা সত্যিকার অর্থেই কোন আদর্শবাদী আন্দোলন হয়ে থাকে। এছাড়াও যে বৈষয়িক দিকগুলো কার্যকর থাকে উপাদান ও লক্ষ্য অর্জনের হাতিয়ার হিসেবে কিংবা কারো কারো কাছে হয়তো ‘বৈষয়িক বা নগদ কিংবা কায়েমী স্বার্থ’টাই মূল; তা হলো- ক্ষমতা, আধিপত্য, অর্থ, বাহাদুরী ইত্যাদি। অবশেষে উদাসীনদের নিরব সমর্থন এবং সিদ্ধান্তহীনদের কোন এক পক্ষকে গ্রহণ করার মাধ্যমে এই আহ্বান পৌঁছে যায় তার চুড়ান্ত পর্যায়ে। আর তখনি জগতবাসী দেখে আদর্শিক লড়াইয়ের চুড়ান্ত রূপ। শান্তি বিলাসীরা যে যাই বলুক না কেন, এটাই হয়ে থাকে যে কোন আন্দোলনের শুরু এবং পরিণতির ধারাবাহিকতায় এই পর্যায়গুলো থাকবেই; না থাকলে তা হবে একটি অসম্পূর্ণ আন্দোলন।
এবারে আমাদের জানার বিষয় ইসলামের আহ্বান কিভাবে আন্দোলনে রূপ নেয়—
পৃথিবীর প্রতিটি মতবাদই যখন একজন ব্যক্তির চিন্তা-চেতনায় আবর্তিত এবং আলোড়িত হয়, তখনি স্বাভাবিক মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে হোক কিংবা ক্ষমতা অথবা স্বার্থভিত্তিক প্রতিষ্ঠা লাভের জন্য হোক কিংবা প্রত্যাদেশ প্রাপ্তির ভিত্তিতে হোক; ব্যক্তি তার ধারণকৃত চিন্তা-দর্শনকে অন্যের নিকট প্রচার করবেই, তা নিয়ে নাড়াচাড়া করবেই, কথাবার্তার মাধ্যমে তার আহ্বান অন্যের কর্ণ সীমায় পৌঁছাবেই। এক থেকে অন্যের কাছে আহ্বান পৌঁছানোর এই ধারাবাহিকতা ধীরে ধীরে বিস্তার লাভ করতে থাকে জন থেকে জনে, এলাকা থেকে এলাকায়, শহর থেকে শহরে এবং দেশ থেকে দেশে দেশে। এভাবেই যে কোন মতবাদ রূপ নেয় একটি আন্দোলনে। আর এই আন্দোলনের মাধ্যমেই পরিবর্তন আসে পৃথিবীর সমাজ ব্যবস্থায়, রাষ্ট্র ব্যবস্থায়, সর্বোপরি মানুষের চিন্তা থেকে কর্মের সুউচ্চ শিখর পর্যন্ত।
ইসলামী আন্দোলনঃ আন্দোলনের এই চিরাচরিত ধারার বাইরে ছিল না আল্লাহ্ প্রদত্ত পূর্ণাঙ্গ জীবন ব্যবস্থা ইসলামও। যদিও ইসলামের মূল কথা এবং প্রধান আহ্বান যুগে যুগেই ছিল এক ও অভিন্ন, তথাপি আল্লাহর দ্বীনের সঠিক পথ থেকে যখনই মানুষ সরে গিয়েছে, তখনি রাব্বুল ‘আলামীন পাঠিয়েছেন তাঁর প্রেরিত পুরুষদেরকে; যাতে করে ভ্রষ্ট মানুষদের ভুল-ভ্রান্তিগুলোকে সংশোধন ও সংস্কার করে চিরন্তন ইসলামকে আবার তার আসল রূপে ফিরিয়ে নিতে পারেন। সেই ধারাবাহিকতায় সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ এবং বিশ্ব নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর আল্লাহর পক্ষ থেকে ওহী আসার পর থেকেই তিনি ঘরে এসে তার সংবাদ দিলেন তার স্ত্রী খাদিজা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহাকে, তিনি তা গ্রহণ করলেন নির্দ্বিধায়। সংবাদ দিলেন ও সংবাদ পেলেন আলী, আবু বকর, যায়েদ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমসহ মক্কার অনেককেই, যারা সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ আল-আমীন বা বিশস্ততার প্রতীক মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের কথাকে অকুণ্ঠ চিত্তে গ্রহণ করে নিলেন। ধীরে ধীরে জানতে শুরু করলো মক্কাবাসীদের অনেকেই। আর এভাবেই সত্যের এই এক মুখ থেকে অন্য কান হয়ে নাড়াচাড়ার মাধ্যমেই মূলতঃ সূত্রপাত ঘটে তৎকালীন আরব ভূখণ্ডের মক্কা নামক শহরে- “ইসলাম” নামক আদর্শের ভিত্তিতে একটি আন্দোলন, একটি حركة, একটি চেষ্টা-সাধনা বা জিহাদ।
প্রারম্ভ যেভাবেঃ গোপনভাবে চলতে থাকে, প্রচার হতে থাকে, ছড়িয়ে পড়তে থাকে দিক থেকে দিগন্তে সর্বশক্তিমান এক আল্লাহর একত্ববাদের এই উদাত্ত আহ্বান- لا إله إلا الله محمد الرسول الله ! চিরাচরিত নিয়মের সীমানায় এখানেও ঘটেছে একই ব্যাপার, স্বচ্ছ-পবিত্র আত্মার অধিকারীরা সাক্ষ্য দিতে শুরু করলো- “আল্লাহ্ ছাড়া সত্যিকারের কোন মা‘বূদ নেই আর মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আল্লাহর রাসূল”। যাদের নিকট ছিল পূর্ববর্তী আসমানী কিতাবসমূহের জ্ঞান, তাদের মধ্য থেকেও দুনিয়ার প্রতি লোভ-লালসা মুক্ত সত্যপন্থীরা অকপটে স্বীকার করেছেন শেষনবীকে এবং তার আনীত সংবাদকে; যেমনটি আমরা দেখতে পাই ওয়ারাকা বিন নওফেল নামক খৃষ্টান ইঞ্জিল লেখকের বক্তব্য থেকে। সে বলেছিলঃ “এ হচ্ছে নামূস (ঊর্ধ্ব আকাশ থেকে ওহী আনয়নকারী ফিরিশ্তা অর্থাৎ, জীব্রীল ‘আলাইহিস্ সালাম) যাকে মূসা ‘আলাইহিস্ সালামের প্রতি নাযিল করা হয়েছিল। আহা! যদি তোমার নবুয়তের সময় আমি শক্তি-সামর্থ রাখতাম! আহা! যখন তোমার জাতি তোমাকে দেশ থেকে বহিস্কার করে দেবে, তখন যদি আমি জীবিত থাকতাম! রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিস্মিত হয়ে বললেনঃ “আমাকে বের করে দেবে?” ওয়ারাকা বললেনঃ হাঁ, তুমি যে মিশন নিয়ে এসেছ, যে-ই এ মিশন নিয়ে এসেছে তার সাথেই তার সাথেই এমন শত্র“তা পোষণ করা হয়েছে। যদি আমি ততদিন বেঁচে থাকি, তাহলে কোমর বেঁধে তোমাকে সাহায্য করবো।” [দেখুনঃ সীরাতে সরওয়ারে আলমঃ তৃতীয় খণ্ড, পৃ-১১০] এ সংবাদ যে সে ইঞ্জিল (বর্তমান নাম নিউ টেষ্টামেন্ট) থেকেই পেয়েছে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এভাবেই সেদিন সত্যপন্থীদের নিকট সত্য উদ্ভাসিত হয়েছিল এবং আজো হচ্ছে, হবে দুনিয়ার ধ্বংসপূর্ব পর্যন্ত; কোন সন্দেহ নেই।
মানবতার প্রতি দয়াময় আল্লাহর রহমত স্বরূপ কুরআনের প্রথম ওহী নাযিল হওয়ার প্রারম্ভ থেকে প্রায় তিন বছর কাল যাবৎ ইসলামের দাওয়াতী কাজ চলতে থাকে গোপনে। এটাই ছিল রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক পরিচালিত ইসলামী আন্দোলনের প্রথম পর্যায়। তারপর আসে দ্বিতীয় পর্যায়- যেখানে প্রকাশ্যভাবে লোকদেরকে আহ্বান করা হয় এই চিরন্তন শান্তি লাভের আদর্শ ইসলামের দিকে। এ প্রসঙ্গে ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বর্ণনা করেন, “একদিন রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাফা পাহাড়ে আরোহণ করলেন এবং বলতে লাগলেনঃ “ يا صباحاه!” (কখনো কোন বিপদের সংবাদ দিতে আরবরা তখন এই শব্দাবলীর ব্যবহার করতো এবং লোকেরা সংবাদ শোনার জন্য সববেত হতো) সবাই সমবেত হয়ে জানতে চাইলোঃ কি হয়েছে? তিনি বললেনঃ হে লোকসকল! আমি যদি বলি যে, এই পাহাড়ের পিছনে বিরাট এক শত্র“-সৈন্য বাহিনী তোমাদের উপর হামলা চালানোর জন্য উঁৎ পেতে আছে, তাহলে তোমরা কি তা বিশ্বাস করবে? লোকেরা বললোঃ নিশ্চয়ই করবো। (কেননা, তুমি কখনো মিথ্যা কথা বলনি, আমরা তোমাকে সাদেক বা সত্যবাদী এবং আল-আমীন বলেই জানি।) তখন রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তাহলে শোন! আমি তোমাদেরকে (আল্লাহর) কঠোর আযাব সম্পর্কে সতর্ক করছি। একথা শুনে আবু লাহাব (রাসূলের চাচা) বললোঃ তুমি কি আমাদেরকে শুধু এইটুকুর জন্যই ডেকেছ?” [মুসনাদে আহমাদঃ ১ম খণ্ড] অন্য এক বর্ণনায় এসেছে, “রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের ঘোষণা শুনে আবু লাহাব হাত নেড়ে বললোঃ ধ্বংস হও তুমি, শুধু এই জন্যই আমাদিগকে একত্রিত করেছ, না?” [ইবনে কাসীর]
ইসলাম এতদিন তার বিদ্বেষকারীদের গোপন ষড়যন্ত্রের শিকার হতে থাকলেও এটাই একদিকে যেমন ছিল ইসলামের প্রথম প্রকাশ্য আহ্বান, তেমনি এটাই ছিল প্রকাশ্য বিরোধিতা। আর এভাবেই ইসলামের এই আন্দোলন প্রকাশ্যভাবে আত্মপ্রকাশ করে বিশ্ববাসীর নিকট। এই ঘোষণার পরপরই সমগ্র কুরাইশ বংশ ও আশপাশের গোত্রগুলোতে যেন দাবানল জ্বলে উঠলো। যারা জানলো না, তারা জানতে পারলো, আর যারা আগে থেকেই গোপনে জানতে পেরেছিল, তারা এবার বুঝে গেছে যে, এই আন্দোলন কতটা বিস্তার লাভ করে ফেলেছে যাতে করে আজ প্রকাশ্য ঘোষণা দেয়ার মত দুঃসাহস করে বসেছে। কিছুদিন পরেই রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম আলী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুকে একটি ভোজনসভা ডাকার আদেশ করলেন। এতে আব্দুল মুত্তালিবের পুরো সম্প্রদায়কে ডাকা হলো যেখানে হামজাহ, আবু তালেব, আব্বাস প্রমুখ প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত হলেন। রাসূল সবার উদ্দেশ্যে বললেনঃ “আমি এমন এক জিনিস নিয়ে এসেছি যা দ্বীন ও দুনিয়া উভয়ের জন্য যথেষ্ট। এই বিরাট বোঝা উত্তলনের কাজে কে আছ আমাকে সাহায্য করবে? তখন সমগ্র কুরাইশ বংশকে চমকে দিয়ে মাত্র তের বছরের বালক আলী উঠে দাঁড়িয়ে বললেনঃ আমার চোখে যদিও যন্ত্রণা অনুভূত হচ্ছে, আমার হাঁটুদ্বয় অত্যন্ত পাতলা, তার উপর বয়সেও আমি সবার কনিষ্ঠ; তবুও আমি আপনার সহযোগিতা করে যাব!” বয়সের ভারে অন্ধ হয়ে যাওয়া ওয়ারাকা বিন নওফেল থেকে শুরু করে পরিণত আবু বকর থেকে বালক আলী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুম কর্তৃক ইসলামের এই কঠিন প্রারম্ভকে এভাবে সাহসিকতার সাথে ইতিহাসের পাতায় উৎকীর্ণ করার মাধ্যমেই তারা আজো হয়ে আছেন বিশ্বব্যাপী ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের প্রেরণার উৎস। উৎস বৃদ্ধদের, উৎস পরিণত বয়সীদের, উৎস বালকদের, উৎস মহিলাদের; ইসলামী আন্দোলনের এই প্রেরণার প্রারম্ভ প্রদীপকে কেউ নেভাতে পারেনি; এবং পারবেও না কোনদিন ইনশাআল্লাহ্।
২.ইসলামী আন্দোলন কেন?
ইসলাম যেমন সর্বশক্তিমান স্রষ্টা আল্লাহর পক্ষ থেকে মানব জাতির জন্য এক চিরন্তন রহমত, তেমনি ইসলামে প্রবেশ করার পর নবী-রাসূলগণের কাজ আঞ্জাম দেয়ার মত মহান সৌভাগ্য অর্জনও সম্ভব ইসলামী আন্দোলনে অংশগ্রহণের মাধ্যমে। সৃষ্টির মধ্যে আল্লাহর নিকট সবচেয়ে সম্মানিত হলেন যুগে যুগে তাঁর প্রেরিত নবী-রাসূলগণ। আল্লাহ্ তাঁর নেয়ামত প্রাপ্তদের বর্ণনা দিতে গিয়ে এবং মানুষকে তাঁর নেয়ামত প্রাপ্তদের সাহচর্য লাভের উৎসাহ দিতে গিয়ে বলেনঃ
“আর কেউ আল্লাহ্ এবং রাসূলের আনুগত্য করলে সে নবী, সিদ্দীক (সত্যনিষ্ঠ), শহীদ ও সৎকর্মপরায়ণ- যাদের প্রতি আল্লাহ্ অনুগ্রহ করেছেন- তাদের সংগী হবে এবং তারা কত উত্তম সংগী।” [সূরা আন্-নিসা: ৬৯]
লক্ষ্যণীয় যে, আয়াতে অনুগ্রহ প্রাপ্তদের মধ্যে সর্ব প্রথমেই রেখেছেন নবীগণকে, কেননা তাদের মাধ্যমেই আল্লাহ্ তা‘আলা যুগে যুগে মানুষকে হেদায়াত দানের বিধান পাঠিয়েছেন পৃথিবীতে। তারপর সে হেদায়াতকে বিনা দ্বিধায় গ্রহণ করে সিদ্দিকীনদের অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন এক দল, আবার অন্য একদল আল্লাহর যমীনে নবী-রাসূলগণের আনীত দ্বীনকে প্রতিষ্ঠিত ও বিজয়ী করার জন্য সাধনা বা জিহাদ করতে গিয়ে নিজের জীবন বিলিয়ে দিয়ে শহীদ হলেন; তারা নেয়ামত প্রাপ্তদের তৃতীয় পর্যায়ে রয়েছেন। অবশেষে সাধারণ জীবন-যাপনে যারা আল্লাহর দ্বীনকে পরিপূর্ণভাবে মেনে চলার সাধনা করেছেন সারাজীবন, তারা রয়েছেন চতুর্থ পর্যায়ে। সুতরাং আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, ইসলামকে আনয়ন, গ্রহণ, প্রতিষ্ঠার সাধনা বা জিহাদে অংশ গ্রহণ এবং পরিপূর্ণ মেনে চলার মাঝেই নিহিত রয়েছে আল্লাহর অফুরন্ত নেয়ামত, যারা তা পেয়েছে, তাদের সংগী হওয়াটা কতই না উত্তম বলে দয়াময় আল্লাহ্ উল্লেখ করেছেন।
মূলতঃ ইসলামের অনুসারী মুসলিম জাতির উত্থানই ছিল ইসলামকে দুনিয়াবাসীর মাঝে ছড়িয়ে দেয়ার জন্য। আর যে কোন মতাদর্শকে ছড়িয়ে দেয়া বা তা নিয়ে নাড়াচাড়া বা তার প্রতি আহ্বান ও ধারাবাহিক অগ্রগতির মাধ্যমে চুড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছানোই যে আন্দোলন তা আমরা পূর্বের আলোচনায় উল্লেখ করেছি। আজকে যারা ধর্মনিরপেক্ষতার ধোঁয়া তুলে মানুষকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছে, তাদের জানা উচিত যে, আল্লাহ্ তা‘আলা তাঁর বাণীতে এবং এই জাতির আদর্শের মূল উৎস আল-কুরআনে তাদের উত্থান সম্পর্কে কি বলেছেন। আল্লাহ্ বলেছেনঃ
“তোমরাই শ্রেষ্ঠ উম্মত, মানব জাতির জন্য তোমাদের আবির্ভাব হয়েছে; তোমরা সৎকাজের নির্দেশ দিবে, অসৎকাজে নিষেধ করবে এবং আল্লাহর উপর ঈমান আনবে।” [সূরা আলে ইমরানঃ ১১০]
আয়াতে বলা হয়েছে, মুসলিম জাতিই পৃথিবীর বুকে শ্রেষ্ঠ জাতি; কোন সন্দেহ নাই। আমাদের যাবতীয় কর্মকাণ্ডের কল্যাণের তরে, মঙ্গলের অন্বেষনে, সাফল্যের লক্ষ্যে। অর্জনের সেই সীমাহীন ক্ষেত্রে মুমিন অর্থাৎ, ঈমানদার অর্থাৎ, মুসলিম সম্পর্কে ইসলামের মহান আদর্শ নেতা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ “মুমিনের ব্যাপারটা বিস্ময়কর। তার সমস্ত বিষয়ই মঙ্গলজনক। মুমিন ব্যতীত অন্য কারো ব্যাপার এরকম নয়। তার কাছে আনন্দদায়ক কিছু পৌঁছুলে আল্লাহর কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করে। ফলে এতে তার মঙ্গল হয়। আর দুঃখজনক কিছু পৌঁছুলে সবর বা ধৈর্য ধারণ করে। ফলে এতেও তার কল্যাণ হয়।” [আবু ইয়াহ্ইয়া সুহাইব বিন সিনান রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বর্ণনা করেন, মুসলিমঃ ২৯৯৯]
মানব জাতির কল্যাণের জন্যই মুসলিম জাতির উত্থান। কেননা তারা দুনিয়ার মানুষকে আহ্বান করবে সৎকাজের প্রতি এবং নিষেধ করবে অসৎ কাজ থেকে। ইসলামে ঈমানের দাওয়াতের পর পরই আসে সৎকাজের আদেশ এবং অসৎকাজের নিষেধ করার পর্যায়। কোন মানুষ যখনি ঈমানের কালেমা উচ্চারণ ও মনে-প্রাণে গ্রহণের মাধ্যমে ইসলামে প্রবেশ করবে, ঠিক তখনি সর্ব প্রথম ও সর্ব প্রধান সৎকাজ হিসেবে তার উপর বর্তাবে সালাত আদায় করা। আর সালাত আদায়ের মাধ্যমে সে অহংকার, আত্মম্ভরিতা, অজ্ঞতা, অশ্লীলতা ইত্যাদি অসৎ গুণাবলী দূর করার মাধ্যমে অসৎ প্রবণতা থেকে মুক্তি পায়। সুতরাং মানুষদের মধ্য থেকে যারাই ঈমান আনার মাধ্যমে মুসলিম জাতিতে প্রবেশ করবে, তাদের উপরই এ দায়িত্ব বর্তাবে যে, তারা আন্তরিকতা ও বাহ্যিক কর্মচাঞ্চল্যতার মাধ্যমে নিজেরা পরিপূর্ণ মুমিন হবে এবং দুনিয়াবাসীকে আহ্বান করতে থাকবে কল্যাণের প্রতি এবং বিরত রাখতে সচেষ্ট হবে সকল প্রকার অকল্যাণ থেকে। আর একথা বলাই বাহুল্য যে, আদর্শ গ্রহণ, তার পালন, তার প্রতি গণমানুষকে আহ্বান এবং আদর্শের বিচারে নির্দিষ্ট সকল প্রকার অকল্যাণ থেকে মানুষকে বিরত রাখার যাবতীয় কর্মকাণ্ডের পুরোটাই নিয়ন্ত্রিত হবে একটি আন্দোলনের সংজ্ঞার আওতায়। তাই নিঃসন্দেহে ইসলাম একটি পরিপূর্ণ ও বিশ্বব্যাপী আন্দোলন তথা ইসলামী আন্দোলন।
৩. মানুষের স্রষ্টার আদেশেই মানুষ ইসলামী আন্দোলন করছে
اسلام ইসলামের মূল কথাই মূলতঃ استلم বা আত্মসমর্পণ। যেমনটি কুরআনুল কারীমে জাতির পিতা ইব্রাহীম ‘আলাইহিস্ সালাম সম্পর্কে এসেছেঃ إِذْ قَالَ لَهُ رَبُّهُ أَسْلِمْ قَالَ أَسْلَمْتُ لِرَبِّ الْعَالَمِينَ অর্থাৎ, “তার রব যখন তাকে বলেছিলেন, ‘আত্মসমর্পণ করুন’, তিনি বলেছিলেন, “আত্মসমর্পণ করলাম জগতসমূহের প্রতিপালকের নিকট”।” [সূরা আল-বাকারাহঃ ১৩১] ইসলামে আনুগত্যেরও মূল কথা এই আত্মসমর্পণ। একজন মানুষ নানাবিধ গুণাবলী নিয়ে পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করে থাকে। তার মধ্যে থাকে কাউকে ভালবাসার গুণাবলী, কিন্তু মুমিন তার সর্বোচ্চ ভালবাসাকে নির্দিষ্ট করবে একমাত্র আল্লাহ্ তা‘আলার জন্য; আর এটাই আত্মসমর্পণ। তার মধ্যে থাকে বিনয়ের মনোভাব, মুমিন তার সর্বোচ্চ বিনয় নির্দিষ্ট করবে একমাত্র তার প্রভু আল্লাহর জন্য; এটাই আত্মসমর্পণ। তার মধ্যে থাকে প্রয়োজনীয় সবকিছু মনে মনে কারো কাছে চাওয়ার প্রবণতা, মুমিন তার সবটুকু চাওয়া-পাওয়ার স্থান নির্দিষ্ট করবে একমাত্র আল্লাহর নিকটই; এটাই তার আত্মসমর্পণ। তার মাঝে থাকে সীমালঙ্ঘনের প্রবণতা, মুমিন তার জীবনের সীমারেখাকে নিয়ন্ত্রিত রাখবে তার একমাত্র স্রষ্টা ও প্রতিপালক আল্লাহর বিধানাবলীতে, যাঁর প্রতি সে প্রতিনিয়ত ধাবমান; এটাই তার আত্মসমর্পণ। ইসলামে প্রবেশকারী প্রতিজন মানুষই তার স্রষ্টা ও প্রতিপালকের পরিচয় লাভ করে, তাঁর নিকট পরিপূর্ণ আত্মসমর্পণ করেই মুসলিম হিসেবে বিবেচিত হন আল্লাহর নিকট।
আর জগতে ইব্রাহীম ‘আলাইহিস্ সালামই যে প্রথম মুসলিম একথা কুরআন তার ভাষায় বর্ণনা করেঃ أَنَاْ أَوَّلُ الْمُسْلِمِينَ অর্থাৎ, “আমিই প্রথম মুসলমান।” [সূরা আন‘আমঃ ১৬৩] এবং তিনিই এ জাতির নামকরণ করেন- ‘মুসলিম’ জাতি হিসেবে। এ প্রসঙ্গে কুরআনুল কারীম উল্লেখ করেঃ مِّلَّةَ أَبِيكُمْ إِبْرَاهِيمَ هُوَ سَمَّاكُمُ الْمُسْلِمينَ অর্থাৎ, “এটা তোমাদের পিতা ইব্রাহীমের মিল্লাত। তিনি আগে তোমাদের নামকরণ করেছেন ‘মুসলিম’।” [সূরা আল-হাজ্জঃ ৭৮] তাহলে এ থেকে প্রতীয়মান যে, স্রষ্টার কাছে পরিপূর্ণ আত্মসমর্পণই যেখানে ইসলাম ও মুসলিমের মূল কথা, সেখানে সেই সর্বশক্তিমান স্রষ্টা ও প্রতিপালক আল্লাহর আদেশ পালন করা যে আত্মসমর্পণের সিদ্ধান্তেরও মূল কথা, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
দুনিয়াতে আল্লাহর প্রেরণ করা সমস্ত নবী-রাসূলগণেরাই বাধার সম্মুখীন হয়েছেন কায়েমী স্বার্থবাদী গোষ্ঠীর দ্বারা; শুধুমাত্র দু’জন ব্যতীত। তাদের একজন হলেন আদম ‘আলাইহিস্ সালাম, যিনি পৃথিবীতে প্রথম মানুষ হওয়ার কারণে বাধার সম্মুখীন হননি, কারণ বাধা দেয়ার তো কেউ ছিল না। আর অপরজন হলেন সুলাইমান ইবনে দাউদ ‘আলাইহিমাস্ সালাম, যিনি তার পিতা দাউদ ‘আলাইহিস্ সালামের প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রে অধিষ্ঠিত হন। তো এই কায়েমী স্বার্থবাদীরা কখনো ছিল গোত্রশক্তি রূপে, কখনো সমাজনেতা রূপে, কখনো রাষ্ট্রশক্তি রূপে। অর্থাৎ, আল্লাহর নবীগণ যখনি মানুষকে মানুষের গোলামী থেকে মুক্তি দিয়ে একমাত্র সর্বশক্তিমান আল্লাহর গোলামীর প্রতি দাওয়াত নিয়ে এসেছেন, তখনি মানুষের প্রভুত্বকারী রাষ্ট্রশক্তি, গোত্রশক্তি, সামাজপতি নেতৃবৃন্দরা তাদের সেই দাওয়াতে বাধার পাহাড় দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। কারণ, তারা নবীগণের দাওয়াত শুনেই বুঝে ফেলেছিল যে, এই দাওয়াত অর্থাৎ, لا إله إلا الله “আল্লাহ্ ছাড়া সত্যিকারের কোন মা‘বূদ বা উপাস্য নেই” -যদি মানুষ গ্রহণ করতে শুরু করে, তাহলে আমাদের নেতৃত্ব-কর্তৃত্ব খতম। তাই তারা সর্বশক্তি দিয়ে এর বিরুদ্ধাচরণে লেগে গেল।
আল্লাহর নবী ইব্রাহীম ‘আলাইহিস্ সালাম যখন তার সর্বশক্তিমান প্রভুর সন্ধান লাভ করে নিজ জাতির নিকট গিয়ে বলতে লাগলেনঃ
قَالَ يَا قَوْمِ إِنِّي بَرِيءٌ مِّمَّا تُشْرِكُونَ – إِنِّي وَجَّهْتُ وَجْهِيَ لِلَّذِي فَطَرَ السَّمَاوَاتِ وَالأَرْضَ حَنِيفاً وَمَا أَنَاْ مِنَ الْمُشْرِكِينَ.
“তিনি বললেন, ‘হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা যাকে আল্লাহর শরীক কর তার সাথে আমার কোন সংশ্রব নেই। ‘আমি একনিষ্ঠভাবে তাঁর দিকে মুখ ফিরাচ্ছি যিনি আকাশমণ্ডলী ও যমীন সৃষ্টি করেছেন এবং আমি মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত নই।’” [সূরা আল-আন‘আমঃ ৭৮-৭৯] তারপর তার জাতির মধ্য থেকে তার পিতা আযরই সর্বপ্রথম তার বিরোধিতা করে বসে। সে ছিল গোত্রে ও রাষ্ট্রে প্রভাবশালী ব্যক্তি এবং আযরের যোগসাজশে শেষ পর্যন্ত তারা ইব্রাহীম ‘আলাইহিস্ সালামকে অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষেপ করে। কিন্তু আল্লাহ্ তাঁর প্রিয় খলীলের জন্য আগুনকে বানিয়ে দিলেন পরম শান্তিময়। আল্লাহ্ তখন বললেনঃ يَا نَارُ كُونِي بَرْداً وَسَلَاماً عَلَى إِبْرَاهِيمَ “হে আগুন! তুমি ইব্রাহীমের জন্য শীতল ও নিরাপদ হয়ে যাও।” [সূরা আল-আম্বিয়াঃ ৬৯] সুতরাং এখানে দেখতে পাচ্ছি যে, ইব্রাহীম ‘আলাইহিস্ সালাম ইসলামের দাওয়াত দিতে গিয়ে সর্বপ্রথম বাধার শিকার হন নিজ পরিবার ও রাষ্ট্রশক্তির দ্বারা। কিন্তু তিনি দমে যাননি; বরং ইসলামের এই দাওয়াতকে বিশ্বময় সম্প্রসারণের উদ্বেগ নিয়েছিলেন। এখানে জাতির পিতার ইসলামের সন্ধান লাভ, দাওয়াত, বাধার মোকাবেলা ও দাওয়াতের ধারাকে সম্মুখে নিয়ে যাওয়ার পুরোটাই ছিল একটি আন্দোলনের সংজ্ঞার আওতায়; কোন সন্দেহ নাই।
আল্লাহ্ তা‘আলা মূসা ‘আলাইহিস্ সালামকে বললেনঃ اذْهَبْ إِلَى فِرْعَوْنَ إِنَّهُ طَغَى “ফির‘আওনের নিকট যান, সে তো সীমালংঘন করেছে।” [সূরা ত্বাহাঃ ২৪] এ আদেশ প্রাপ্ত হয়ে মূসা ‘আলাইহিস্ সালাম যখন তার নিজের পরিবার থেকে সাহায্যকারীর আবেদন করলেন, তখন আল্লাহ্ তার ভাই হারূন ‘আলাইহিস্ সালামকে তার নবুয়তী কাজে সাহায্যকারী নিযুক্ত করলেন এবং একই সূরা অন্যত্র বলেনঃ اذْهَبَا إِلَى فِرْعَوْنَ إِنَّهُ طَغَى “আপনারা উভয়ে ফির‘আওনের কাছে যান, সে তো সীমালংঘন করেছে।” [সূরা ত্বাহাঃ ৪৩] তারপর ইতিহাসের পাঠক মাত্রেরই জানা যে, ফির‘আওনের সাথে মূসা ও হারূন ‘আলাইহিমাস্ সালাম এবং বনী ইস্রাঈল জাতির যে সংঘাত এবং মূসা ‘আলাইহিস্ সালামের বনী ইস্রাঈল জাতিকে নিয়ে মিসর ত্যাগ করে সীনাই উপত্যকায় গমন, পথে ধাওয়া করতে গিয়ে নীল নদে ফির‘আওনসহ তার বাহিনী আল্লাহর আযাবে নিপতিত হয়ে সলীল সমাধি ইত্যাদি। এসবই মূলতঃ ছিল আল্লাহর দ্বীনের তথা ইসলামের চিরন্তন আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় নবীগণের সাথে রাষ্ট্রশক্তির সংঘাত; যা আজো চলছে এবং চলবে কেয়ামত অবধি।
এমনিভাবে আল্লাহ্ তা‘আলা কুরআনুল কারীমের মাধ্যমে আমাদেরকে জানিয়ে দেন যে, অন্যান্য নবী-রাসূলগণও কিভাবে তাদের জাতির নিকট আল্লাহর দ্বীনের দাওয়াত নিয়ে গেছেন এবং তাদের সাথেও তাদের জাতি কি কি দুর্ব্যবহার করেছে এবং পরিণামে জাতির নিকৃষ্ট লোকেরা কিভাবে দুনিয়াতেই ধ্বংস হয়ে গেছে। যেমন- নূহ্ ‘আলাইহিস্ সালাম সম্পর্কে এসেছে-
وَلَقَدْ أَرْسَلْنَا نُوحاً إِلَى قَوْمِهِ إِنِّي لَكُمْ نَذِيرٌ مُّبِينٌ - أَن لاَّ تَعْبُدُواْ إِلاَّ اللّهَ إِنِّيَ أَخَافُ عَلَيْكُمْ عَذَابَ يَوْمٍ أَلِيمٍ - فَقَالَ الْمَلأُ الَّذِينَ كَفَرُواْ مِن قِوْمِهِ مَا نَرَاكَ إِلاَّ بَشَراً مِّثْلَنَا وَمَا نَرَاكَ اتَّبَعَكَ إِلاَّ الَّذِينَ هُمْ أَرَاذِلُنَا بَادِيَ الرَّأْيِ وَمَا نَرَى لَكُمْ عَلَيْنَا مِن فَضْلٍ بَلْ نَظُنُّكُمْ كَاذِبِينَ.
“আমি তো নূহকে তার সম্প্রদায়ের কাছে পাঠিয়েছিলাম। তিনি বলেছিলেন, ‘আমি অবশ্যই তোমাদের জন্য প্রকাশ্য সতর্ককারী,’ – ‘যেন তোমরা আল্লাহ্ ছাড়া অন্য কিছূর ‘ইবাদাত না কর; আমি তো তোমাদের জন্য এক মর্মন্তুদ দিনের শাস্তি আশংকা করি।’ – তার সম্প্রদায়ের নেতারা, যারা ছিল কাফির তারা বলল, ‘আমরা তোমাকে তো আমাদের মত মানুষ ছাড়া কিছু দেখছি না; আমরা তো দেখছি, তোমার অনুসরণ করছে তারাই, যারা আমাদের মধ্যে বাহ্য দৃষ্টিতেই অধম এবং আমরা আমাদের উপর তোমাদের কোন শ্রেষ্ঠত্ব দেখছি না, বরং আমরা তোমাদেরকে মিথ্যাবাদী মনে করি।’” [সূরা হূদঃ ২৫-২৭] এখানে আল্লাহর দ্বীনের বিরুদ্ধবাদীদের অহংকার ও হীনমন্যতা পরিস্ফুট; যা আজো ইসলাম পন্থীদের বিরুদ্ধে তারা ব্যবহার করছে। এভাবেই প্রত্যেক নবীই তাদের স্ব স্ব জাতির নিকট আল্লাহর চিরন্তন দ্বীনের দাওয়াতকে নিয়ে নাড়াচাড়া করেছেন, حركة করেছেন, মানুষকে ডেকেছেন, মানুষের বাধা সহ্য করেছেন, নিহত হয়েছেন, সর্বোপরি তাদের দ্বীন প্রচার ও প্রতিষ্ঠার কার্যক্রমই যে বর্তমানের ব্যবহৃত কোন আন্দোলনের সংজ্ঞা; তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
এভাবে আল্লাহ্ সোবহানাহু ওয়াতা‘আলা নবী-রাসূলদের পরম্পরা অনুযায়ী সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তার উম্মাতদের জন্যও বলেছেন একই কথা। তিনি বলেনঃ
كُنتُمْ خَيْرَ أُمَّةٍ أُخْرِجَتْ لِلنَّاسِ تَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَتَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنكَرِ وَتُؤْمِنُونَ بِاللّهِ.
“তোমরাই শ্রেষ্ঠ উম্মত, মানব জাতির জন্য তোমাদের আবির্ভাব হয়েছে; তোমরা সৎকাজের নির্দেশ দিবে, অসৎকাজে নিষেধ করবে এবং আল্লাহর উপর ঈমান আনবে।” [সূরা আলে-ইমরানঃ ১১০] এ আয়াতে মুসলিম জাতির মর্যাদা, তাদের আবির্ভাবের কারণ, যে কর্ম সম্পাদনের জন্য তাদের উত্থান; এসব মৌলিক প্রশ্নের জবাবগুলো আমাদের সম্মুখে পরিস্কারভাবে ফুটে উঠে। কোন মানুষ অন্যকে সৎকর্মের আদেশ দিতে গেলে আগে নিজের মধ্যে তা ধারণ করতে হয়; আর এভাবে একজন মুসলিম তার উপর আল্লাহ্ প্রদত্ত দায়িত্ব পালন করার পূর্বেই নিজেকে সংশোধন করার সুযোগ পায়। অন্যদিকে অসৎকর্মের ব্যাপার তদ্রূপ। তাহলে এমন জাতি পৃথিবীতে শ্রেষ্ঠ হবে না কেন, যারা অন্যকে বলার পূর্বেই নিজেরা তা অর্জন করে নেয়ার আদেশপ্রাপ্ত।
এ জাতির মধ্য থেকে সফলকাম লোকদের কথা বলতে গিয়ে অন্যত্র আল্লাহ্ তা‘আলা বলেনঃ
وَلْتَكُن مِّنكُمْ أُمَّةٌ يَدْعُونَ إِلَى الْخَيْرِ وَيَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَيَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنكَرِ وَأُوْلَـئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ.
“তোমাদের মধ্যে এমন একটি দল যেন থাকে যারা কল্যাণের দিকে আহ্বান করবে এবং সৎকাজের নির্দেশ দেবে ও অসৎকাজে নিষেধ করবে; আর এরাই সফলকাম।” [সূরা আলে-ইমরানঃ ১০৪] কর্মের সাফল্য বিচারে যেমন সব মানুষের মর্যাদা সমান নয়, তেমনি সাধারণভাবে এ জাতির মধ্যেও উচ্চ মর্যাদার ক্ষেত্রে একদল লোক থাকবে এগিয়ে, তারা কারা সে ব্যাপারে উক্ত আয়াতের মাধ্যমে আমরা চিনে নিতে পারি। পরন্তু আল্লাহ্ নিজেই ঘোষণা দিয়েছেন যে, তারাই সফলকাম। বর্তমান বিশ্বের অধিকাংশ মুসলিম মূলতঃ আজ পৃথিবীর বুকে তাদের উত্থানের মূল রহস্য সম্পর্কেই বেখবর। তাই তারা অন্ধকার ঘরে কালো সুঁই খোঁজার মত করেই হতাশ হয়ে ছুটছে বিশ্বের আর সব ধূর্ত ও বস্তুবাদী জাতিসমূহের প্রতি। তারা আজ সেই মোহাবিষ্ঠের মত, যার ঘরের দেয়ালে লুকানো মনি-মুক্তা; অথচ জানতে পারেনি বা জানতে চায়নি বলে ভিক্ষে করে খায়।
আল্লাহ্ সোবহানাহু ওয়াতা‘আলা পূর্ববর্তী নবী-রাসূলগণের উদাহরণ টেনে এ জাতির সবচেয়ে বড় যে কাজ; যা তিনি মুসলিম উম্মাহ্র জন্য বিধিবদ্ধ করেছেন, তার ঘোষণা দিচ্ছেন এভাবেঃ
شَرَعَ لَكُم مِّنَ الدِّينِ مَا وَصَّى بِهِ نُوحاً وَالَّذِي أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ وَمَا وَصَّيْنَا بِهِ إِبْرَاهِيمَ وَمُوسَى وَعِيسَى أَنْ أَقِيمُوا الدِّينَ وَلَا تَتَفَرَّقُوا فِيهِ.
“তিনি তোমাদের জন্য বিধিবদ্ধ করেছেন দ্বীন যার নির্দেশ দিয়েছিলেন তিনি নূহ্কে, আর যা আমি ওহী করেছি আপনাকে এবং যার নির্দেশ দিয়েছিলাম ইব্রাহীম, মূসা ও ‘ঈসাকে, এ বলে যে, আপনারা দ্বীনকে প্রতিষ্ঠিত করুন এবং তাতে মতভেদ করবেন না।” [সূরা আশ্-শূরাঃ ১৩] মোটকথা, মুসলিম জাতির সর্ববৃহৎ যে দায়িত্ব তা হচ্ছে আল্লাহর যমীনে আল্লাহর দ্বীনকে প্রতিষ্ঠিত করা। যমীন আল্লাহর, সৃষ্টিরাজি আল্লাহর, যে মানুষ ও জিন আল্লাহর নাফরমানী করছে, তাদের শারিরিক বিভিন্ন প্রক্রিয়াও চলছে আল্লাহরই নিদের্শে; শুধুমাত্র ইচ্ছের স্বাধীনতাটুকুই ছেড়ে দিয়েছেন তাদের ইখতিয়ারে কারণ আল্লাহ্ এর মাধ্যমে তার পরীক্ষা নিতে চান বলে। সুতরাং এমন অবস্থা যেখানে বাস্তবতা, সেই যমীনে আল্লাহর আদেশ-নিষেধের বাস্তবায়নই একজন মুসলিমের সবচেয়ে বড় কাজ না হলে আর কি হতে পারে? ইসলামের অন্যান্য সমস্ত ইবাদাত-বন্দেগী মূলতঃ এই মহান কর্ম সম্পাদনের যোগ্যতা অর্জনেরই নিয়মিত ট্রেনিং মাত্র।
আরেকটু সহজ করে বুঝতে হলে তা হবে এমন- মুসলিম জাতির প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে আল্লাহর পৃথিবীতে আল্লাহর আদেশের বাস্তবায়ন বা আল্লাহর দ্বীনের প্রতিষ্ঠা। এখন কেউ যদি তার লক্ষ্যের পানে ছুটতে থাকে, তাহলে নিশ্চিতভাবেই সে তার লক্ষ্য অর্জনের কর্মকাণ্ডের আওতার ভেতরেই অবস্থান করে। যেহেতু আল্লাহর আদেশ তাঁর যমীনে তাঁর দ্বীনকে প্রতিষ্ঠিত করা, সেহেতু যারাই এই মহান লক্ষ্যকে নিজের জীবনেরও আসল লক্ষ্য হিসেবে নির্ধারণ করেছে, তার জীবনের সব ইবাদাত, সমস্ত কাজকর্মই হবে সেই লক্ষ্যের আওতাধীন; আর এভাবেই আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের একজন মুসলিম তার প্রতিপালক আল্লাহর ইবাদাতের বা গোলামীর বা বন্দেগীর সম্পূর্ণ আওতাধীন হয়ে যান। যার জন্য আল্লাহ্ তাকে সৃষ্টি করেছেন, কেননা আল্লাহ্ তা‘আলা বলেনঃ
وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنسَ إِلَّا لِيَعْبُدُونِ.
“আমি সৃষ্টি করেছি জিন এবং মানুষকে এজন্যেই যে, তারা আমার ‘ইবাদাত করবে।” [সূরা আয্-যারিয়াতঃ ৫৬] এবং যে জন্য ইবলীসের সাথে আমাদের মা‘বূদ আল্লাহ্ তা‘আলার চ্যালেঞ্জ হয়েছেঃ
قَالَ أَرَأَيْتَكَ هَـذَا الَّذِي كَرَّمْتَ عَلَيَّ لَئِنْ أَخَّرْتَنِ إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَةِ لأَحْتَنِكَنَّ ذُرِّيَّتَهُ إَلاَّ قَلِيلاً
অর্থাৎ, “সে (ইবলীস) বলেছিল, ‘আপনি কি বিবেচনা করেছেন, আপনি আমার উপর এ ব্যক্তিকে (আদম ‘আলাইহিস্ সালামকে) মর্যাদা দান করলেন, কিয়ামতের দিন পর্যন্ত যদি আমাকে অবকাশ দেন তাহলে আমি অল্প কয়েকজন ছাড়া তার (আদমের) বংশধরকে অবশ্যই (আমার) কর্তৃত্বাধীন করে ফেলব’।” [সূরা বনী-ইস্রাঈলঃ ৬২]
জবাবে আমাদের প্রিয় প্রতিপালক আল্লাহ্ বললেনঃ
إِنَّ عِبَادِي لَيْسَ لَكَ عَلَيْهِمْ سُلْطَانٌ অর্থাৎ, “নিশ্চয়ই ‘আমার বান্দাদের উপর তোমার কোন ক্ষমতা নেই’।” [সূরা বনী-ইসরাঈলঃ ৬৫] আমি বলবো- মুসলিমদের জন্য কি এখনো সময় আসেনি যে, তারা তাদের সবচেয়ে বড় শত্র“ ইবলীসের চ্যালেঞ্জের বিপরীতে নিজেদের ইবাদাতের উচ্চতা দিয়ে প্রমাণ করবে যে, তারা তাদের সর্বশক্তিমান প্রতিপালক আল্লাহর বান্দা? তাদের জন্য কি সময় আসেনি যে, তারা প্রমাণ দিবে যে, তারা ইবলীসের গোলাম নয়? তাদের জন্য কি এখনো একথা ভাববার সময় আসেনি যে, তারা কার প্রতি ধাবিত হচ্ছে প্রতিটি মুহূর্তে? আল্লাহ্ তো এদের লক্ষ্য করেই বলছেনঃ فَأَيْنَ تَذْهَبُونَ “অতএব তোমরা কোথায় যাচ্ছ?” [সূরা আত্-তাকভীরঃ ২৬]
মোদ্দাকথা, এভাবেই একজন মুমিন তার স্রষ্টার পক্ষ থেকে আদেশপ্রাপ্ত হয়েই প্রতিপালকের ভয়ে, ভালবাসায়, মানবতার কল্যাণে, নিজের দুনিয়া ও আখেরাতের সমূহ সাফল্য লাভ কল্পে, আল্লাহর দ্বীনকে ভালবেসে তা আল্লাহর যমীনে প্রতিষ্ঠিত করার আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ে নিজের সম্পদ ও জীবন নিয়ে। আর একজন মুমিনের জন্য এর বেশী আর কি প্রয়োজন যেঃ
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُواْ كُونُواْ قَوَّامِينَ لِلّهِ شُهَدَاء بِالْقِسْطِ.
“হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহর উদ্দেশ্যে সত্য-ন্যায়ের সাক্ষ্যদানে অবিচল হয়ে দাঁড়াও!” [সূরা আল-মায়েদাঃ ৮] আর আল্লাহর মনোনীতি দ্বীন ইসলামের চাইতে সত্য-ন্যায় আর কি হতে পারে? নিজ থেকে শুরু করে বিশ্বময় ইসলামের ন্যায়নীতির মডেল স্বরূপ সাক্ষ্য দানের আদেশের চেয়ে ব্যাপক আর কি কথার প্রয়োজন হতে পারে?
৪. যালেম এবং মযলুমের মুক্তিতে ইসলামী আন্দোলন
পৃথিবীর জাতিসমূহের মধ্যে একমাত্র মুসলিম জাতিরই উত্থান হয়েছে মানুষের কল্যাণের জন্য। অন্য সব ধর্মে অপরের কল্যাণ সাধনের উপদেশ থাকলেও এমনভাবে বলা হয়নি যে, أُخْرِجَتْ لِلنَّاسِ “মানব জাতির জন্যই তোমাদের আবির্ভাব হয়েছে।” [সূরা আলে-ইমরানঃ ১১০]। যে কোন দল বা জাতির উত্থানের পেছনে কোন না কোন কারণ থাকে, কেউ নির্যাতিত হয়ে প্রতিশোধ কল্পে, কেউ নতুন কোন স্বাধীন ভূখণ্ড পেতে, কেউ ঐতিহ্যগতভাবে পাওয়া বংশ পরম্পরায়, কেউ বা অতীত দিনের ধর্মানুসারী হিসেবে পরিচয় প্রতিষ্ঠিত করে। সপ্তম শতাব্দীর আরব উপদ্বীপসহ সমগ্র পৃথিবীতে যখন চলছিল চরম নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি, যখন মানুষে মানুষে অতি নগন্য বিষয় নিয়ে শতাব্দির পর শতাব্দি চলতো রক্তক্ষয়ী লড়াই, যখন এসব যুদ্ধে হেরে গেলে মেয়েরা বিজিতদের দাসীতে পরিণত হবে এই ঠুনকো অহংয়ের মোহে আঁতুড়েই মেরে ফেলতে চাইতো কন্যাসন্তানদের, একান্ত তখন না পারলে পরবর্তীতে জীবন্ত কবর দিত, যখন মননে, মস্তিষ্কে, পরিবেশে, সংস্কৃতিতে সত্যিকারের ইব্রাহিমী দ্বীন তথা একত্ববাদের পরিবর্তে অসংখ্য ধারার মূর্তিপূজা ও শির্কের সমারোহ চলছিল; তখনি আল্লাহ্ তাঁর মনোনীত নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের মাধ্যমে সমগ্র মানব জাতির জন্য প্রেরণ করলেন তাঁর মনোনীত দ্বীন ইসলাম।
মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম পৃথিবীর বুকে এমন এক সত্তা যিনি আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত সমস্ত নবীরাসূলগণের ছিলেন নেতা। তাই অন্য সব নবীর মতই; বরং তারচেয়েও অধিকমাত্রার তত্ত্ববধানে তাকে প্রতিপালন করেছেন আল্লাহ্ তা‘আলা, কেননা তার মাধ্যমেই যে তিনি দুনিয়ার বুকে মযলুম মানবতার সংবিধান ইসলামকে প্রতিষ্ঠিত করবেন। আর তাই আমরা দেখতে পাই ইসলাম পূর্বকালেই তৎকালীন কুরাইশ এবং হাওয়াজিন গোত্রদ্বয়ের মধ্যে ৫৮৫ থেকে ৫৯০ খৃষ্টাব্দ পর্যন্ত চলা ‘হারব আল-ফুজ্জার’ অন্যায় সমর নামক বিনাশী যুদ্ধের অবসানকল্পে যুবসমাজকে সংগঠিত করে গঠন করেন ‘হিলফুল ফুযূল’ বা কল্যাণের শপথ নামক যুদ্ধবিরতির শান্তি কমিটি। যুদ্ধ যখন যেখানেই বাঁধুক না কেন, তাতে নিষ্পেষিত হয় অধিকাংশ সাধারণ মানুষ, সম্পদ বিনষ্ট হয় সাধারণেরই, সবমিলিয়ে যুলুমের শিকার হয় সাধারণ জনগণ; মূলতঃ উপরোল্লেখিত ‘হিলফুল ফুযূল’ ছিল এই যুলুমের হাত থেকে গণসাধারণকে মুক্তি দানের লক্ষ্যেই। তৎপরবর্তীতে তার চল্লিশ বছর পূর্তির পর নবুয়ত প্রাপ্তির সাথে সাথে শুরু হয় ইসলামের অগ্রযাত্রা; যেখানে আশ্রয় পেতে থাকে পর্যায়ক্রমে ক্রীতদাস বেলাল থেকে শুরু করে কুরাইশ নেতা হামযা, উমার রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমের মত মানুষেরা, যারা শারিরিক যুলুম-নির্যাতন থেকে শুরু করে বিশ্বাসগত কিংবা সামাজিক বিবিধ কঠোর যুলুমের শিকার হয়েছিলেন বিভিন্নভাবে। ইসলাম তাদেরকে যুলুমের অন্ধকার থেকে মুক্তি দিয়ে আলোকের পথ দেখালেন, আর সে আলোকের আহ্বানে সংগঠিত হয়ে যে জিহাদ বা বৃহত্তর আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন তারা, যার মাধ্যমে যুলুম থেকে মুক্তি পেল তৎকালীন অর্ধপৃথিবী; বর্তমানের প্রেক্ষাপটে তাই ইসলামী আন্দোলন নামে পরিচিতি লাভ করে।
যুলুমের যত রকম সংজ্ঞা বা ধরনই থাকুক না কেন, মানুষ সবচেয়ে বড় যুলুম করে থাকে তার নিজের সাথে। অথচ আমরা প্রত্যেকেই যা কিছুই করি না কেন, সবি করে থাকি নিজের জন্য, নিজের কল্যানের জন্য। কিন্তু সময়ে সময়ে এমন কিছু আমরা করে ফেলি যা সাময়িক ভাবনায় কল্যাণ মনে হলেও তার পরিণাম অত্যন্ত ভয়াবহ হয়ে থাকে। তাই কখনো জেনে, কখনো অজ্ঞানতায় সবচেয়ে বড় যুলুম হয়ে যায় নিজের উপরই। মানুষ যে কোন কারণেই হোক জীবন সম্পর্কে সঠিক ধারণা লাভ করতে না পারলেও তার ধারনারা কিন্তু থেমে থাকে না, কোন না কোন অলীক কল্পগাঁথাকে সে তার জীবনের জন্য গ্রহণ করবেই। এভাবেই সে অতীত-বর্তমান এবং অনাগত মহাজীবনের উপর করে বসে এক মহা যুলুম; যা তার সমস্ত কর্মকাণ্ডের উপরই প্রভাব ফেলে। এরপর তো থাকে তার জীবনজোড়া কর্মকাণ্ড, যাকে আমরা প্রকাশ্যভাবেই যুলুম বলে জানি।
আকীদা-বিশ্বাসের যুলুমের পথ ধরেই সে তার স্রষ্টা প্রতিপালকের সাথে যুলুমে লিপ্ত হয়, সে তাঁকে তাঁর যথাযথ মর্যাদা দানে ব্যর্থ হয়, ব্যর্থ হয় সম্মান প্রদর্শনে, ব্যর্থ হয় তাঁর কাছ থেকে চাওয়া-পাওয়া থেকে। বিরত সে কখনোই থাকে না; বরং তার নিজের চাইতেও নিকৃষ্ট বস্তুনিচয়ের নিকট ভিক্ষার হাত পেতে নিজেকে এবং তার সর্বশক্তিমান স্রষ্টাকেও অসম্মান করার মাধ্যমে তাঁর রহমত ও দানের বরকত থেকে বঞ্ছিত হয় জীবন জুড়ে। সর্বশেষে থাকছে যা আমাদের নিকট প্রকাশিত অর্থাৎ, নিজ সত্তা ও নিজ স্রষ্টার পরে অন্যান্য সৃষ্টির সাথে কৃত যুলুম। এই পর্যায়ে থাকছে সৃষ্টিসেরা মানুষ থেকে শুরু করে পশুপাখি, জীবজানোয়ার, উদ্ভিদ, কীটপতঙ্গ ইত্যাদি। এই প্রকারের যুলুমের মাধ্যমে ব্যক্তি শুধু মযলুমেরই ক্ষতি করে না; বরং সে নিজেরই মহাক্ষতি সাধন করে থাকে। সাময়িকভাবে আমরা দেখতে পাই নিগৃহীত হয়েছে মযলুম, কিন্তু নির্দিষ্ট সময়েই নিচুতায় পতিত হয়েছে যালেম এবং অনন্ত জীবনের কঠিন শাস্তিসমূহ তো তার জন্য সম্মুখেই অপেক্ষমান রয়েছে; বরং কখনো কখনো যুলুম-পাপের মাত্রা সীমা ছাড়িয়ে গেলে সাজা দুনিয়া থেকেই শুরু হয়ে যায়।
সব মিলিয়ে আমরা পেলাম যুলুমের তিনটি ধরণ- (এক) নিজের সাথে যুলুম, (দুই) স্রষ্টার সাথে যুলুম এবং (তিন) সৃষ্টির সাথে যুলুম।
এক. নিজের সাথে যুলুম
যুলুমের তিনটি মৌলিক ধরন- নিজের সাথে যুলুম, স্রষ্টার সাথে যুলুম এবং সৃষ্টির সাথে যুলুম; এসবের মূলেও রয়েছে অনুরূপ তিনটি কারণ। (১) অজ্ঞানতা, (২) জেনেও না মানার প্রবণতা ও (৩) নৈতিক অধঃপতন। এসব পর্যায়গুলো আমাদের জীবনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত একান্তভাবেই জড়িত। সত্যিকারের মানবিক গুণাবলী যেসব মানুষের মধ্যে রয়েছে, কেবলমাত্র তারাই পারে এসবে উত্তীর্ণ হয়ে সত্যিকারের মানুষ হতে। আর সত্যিকারের মানুষ হতে হলে যেসব গুণাবলী মানুষের স্বাভাবিক জ্ঞান স্বীকৃত; সেসব গুণাবলীকেই ইসলাম তার বিধানাবলীতে সৎকাজ হিসেবে গণ্য করে দিয়েছে। এ জন্যই ইসলামকে বলা হয় ‘স্বভাব ধর্ম’ বা ‘মানবতার ধর্ম’। এখানে যেমন গুরুত্ব দেয়া হয়নি স্ফীত মস্তিষ্ক প্রসূত ভাসামান চিন্তাধারাকে, তেমনি স্থান দেয়া হয়নি চতুরতামূলক একপেশে কুটিলতাকে। বরং যে বিষয় যতটা মারাত্মক এবং গভীরতাসম্পন্ন, সে বিষয়কে ততটা কঠোরতার সাথে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তদ্রূপ যে বিষয় ফলাফলের দিক দিয়ে উপকারী নয়; বরং ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কিন্তু সর্বশেষ ফলাফলে তা ক্ষতির কারণ হয় দাঁড়ায় সেসবকেও অনুৎসাহিত করা হয়েছে যথাযথভাবে। অন্যদিকে ক্ষুদ্র-বৃহৎ যাবতীয় সৎ ও ভাল কাজকেই উৎসাহিত করা হয়েছে বিপুল পুরস্কারের বিনিময়ে।
ইসলাম তাই তার সর্বপ্রথম বাণীতেই অজ্ঞানতার বিদঘুটে অন্ধকারাচ্ছন্ন প্রাচীরে আঘাত হেনেছে এভাবে- اقْرَأْ বা “পড়” অর্থাৎ, জান, জ্ঞান অর্জন কর, মূর্খতার এঁদো ডোবায় নিমজ্জিত থেকো না; জ্ঞান অর্জন করে বেরিয়ে আস আলোকের উজ্জলতায়। আমাদের চারপাশের সাধারণেও এ ব্যাপারটি পরিলক্ষিত হয় যে, যতদিন ব্যক্তি অক্ষরজ্ঞানহীন ও যাবতীয় জাগতিক বিষয়াদি সম্পর্কে অজ্ঞতায় ডুবে থাকে, ততদিনই যালেম সম্প্রদায় তাকে নানাভাবে পারে ঠকাতে, নির্যাতন করতে, প্রকাশ্য দিবালোকে বিচারের নামে লুণ্ঠন করতে ধনসম্পদ, ইজ্জত-সম্মান; কিন্তু একই ব্যক্তিকে সেসব বিষয়ে জ্ঞান দান করা সম্ভব হলে সে রুখে দাঁড়াবে সেই অত্যাচার যুলুমের বিরুদ্ধে তার লব্ধ জ্ঞান দ্বারা, সত্তাগত বুদ্ধি দ্বারা, যুক্তি দ্বারা; তাকে ঠকানো, তাকে যুলুমের ধাতব চাকায় পিষ্ট করা আর সম্ভব হয়ে উঠে না তখন।
এবার এসব জাগতিকতার বাইরে জীবনের বিশালতায় তাকিয়ে দেখুন তো- সেখানে ব্যক্তি দেখতে পাবে তার স্রষ্টার পরিচয়, কারুকাজ, সৃজনীয় সৌন্দর্য্যাবলী, সেসবের উপকার-অপকার, দেখতে পাবে স্বীয় কর্মের গতি কোন পথে, সেখানে কতটা সহজতা আর কতটা কঠিনতা, দেখবে অনাগত ফলাফলের উত্তপ্ত অথবা পরম শান্তিময় স্বরূপ, তার চিন্তা তখন খুলির কয়েক ইঞ্চির কারাগার থেকে অবমুক্ত হয়ে বিশালতাকে পরিগ্রহণ করতে সামর্থ্য হবে, সে দেখতে পাবে অন্তরচোখে ঐ মহাকাশোপারের দৃশ্যাবলী, পাতালের অতলতার গুঢ় রহস্য, মূলতঃ জ্ঞানের মহাজাগতিক পথে সে তখন তার আত্মাকে পরিচালিত করতে পারবে মহাসাফল্যের চির আলোকদীপ্ত পথে। আর তাইতো আমাদের আলোকপথের পরম দাতা আল্লাহ্ তা‘আলা আমাদের বিবেকের কাছে প্রশ্ন রেখে জানতে চাইলেনঃ هَلْ يَسْتَوِي الَّذِينَ يَعْلَمُونَ وَالَّذِينَ لَا يَعْلَمُونَ “যারা জানে এবং যারা জানে না, তারা কি সমান?” [সূরা আয্-যুমারঃ ৯]। কখনো নয়; তারা সমান হতে পারে না। তাদের মধ্যে তো পার্থক্য রয়েছে অন্ধ এবং দৃষ্টিসম্পন্নের। আর একথা বলাই বাহুল্য যে, মুসলিম অমুসলিম নির্বিশেষে জগতের জ্ঞানী সম্প্রদায়ের নিকট ইসলামের জ্ঞানের ভাণ্ডার এই বিশ্বকে ছাড়িয়ে বিগত-অনাগত সকল সময়কে ধারণ করেছে, সবচেয়ে সঠিক ব্যাখ্যা দান করেছে।
জগতের সমস্ত অজ্ঞজনকে অন্ধকার হতে বিজ্ঞতার আলোকে নিয়ে আসার জন্য ইসলাম তার অনুসারীদেরকে আদেশ করেছে। আর এ আদেশ দানের পূর্বেই আল্লাহ্ তাঁর বান্দাদের যা শিখিয়েছেন ও শিখাচ্ছেন ক্রমাগত, তা কুরআনের সর্বপ্রথম নাযিলকৃত পাঁচটি আয়াতের শেষটিতে উল্লেখ করেঃ
عَلَّمَ الْإِنسَانَ مَا لَمْ يَعْلَمْ
“(আল্লাহ্) শিক্ষা দিয়েছেন মানুষকে, যা সে জানত না।” [সূরা ‘আলাকঃ ৫]। অন্যত্র প্রথম মানুষ আদম ‘আলাইহিস্ সালাম সম্পর্কে বলেনঃ
وَعَلَّمَ آدَمَ الأَسْمَاء كُلَّهَا “(আল্লাহ্) আদমকে সমস্ত জিনিসের নাম শিক্ষা দিয়েছেন।” [সূরা আল-বাকারাঃ ৩১]। অতঃপর আল্লাহ্ তা‘আলা মুসলিম জাতি সম্পর্কে বলেনঃ
كُنتُمْ خَيْرَ أُمَّةٍ أُخْرِجَتْ لِلنَّاسِ تَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَتَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنكَرِ “তোমরাই শ্রেষ্ঠ উম্মত, মানব জাতির জন্য তোমাদের আবির্ভাব হয়েছে; তোমরা সৎকাজের নির্দেশ দিবে, অসৎকাজে নিষেধ করবে।” [সূরা আলে-ইমরানঃ ১১০]। আর একথা সর্বজন স্বীকৃত যে, সৎকাজের আহ্বান করতে হলে তা অবশ্যই শুরু করতে হবে সৎ বা ভাল বা উত্তম কথা দ্বারা। তাই আল্লাহ্ অন্যত্র বলেনঃ
وَمَنْ أَحْسَنُ قَوْلاً مِّمَّن دَعَا إِلَى اللَّهِ “ঐ ব্যক্তির চেয়ে উত্তম কথা আর কার হতে পারে, যে আল্লাহর প্রতি মানুষকে ডাকে।” [সূরা ফুসসিলাতঃ ৩৩]। মূলতঃ আল্লাহর পথে আহ্বানকারীর এ ডাক শুনে শুনেই আদম থেকে শুরু করে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম পর্যন্ত এবং মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে শুরু করে আজ অবধি দলে দলে অন্ধকারের যাত্রীরা এসে জড়ো হচ্ছে আলোর সামিয়ানা তলে, হতে থাকবে ইনশাআল্লাহ্ পৃথিবীর ধ্বংস পূর্ব পর্যন্ত।
পৃথিবীতে আজ নবী উপস্থিত নেই, তদুপরি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামই হলেন আল্লাহর পক্ষ হতে সর্বশেষ নবী ও রাসূল। তাহলে জগতের অজ্ঞজনদেরকে আজ কে দেখাবে আলোর পথ, কে হবে তাদের দিশারী? একথার জবাবে রয়েছে সমগ্র মুসলিম উম্মাহ্, কেননা শুরুতেই বলা হয়েছে যে, এ জাতির উত্থানই হয়েছে মানুষের কল্যাণ সাধন করার নিমিত্ত। তাই মুসলমানদের মধ্য থেকে যারাই নবীরাসূল ‘আলাইহিমুস্ সালামগণের দায়িত্ব পালনে দৃঢ় সংকল্প বদ্ধ হয়, সত্যিকার অর্থে তারাই পালন করে যাচ্ছে এ জাতির উত্থানের পেছনের সুমহান দায়িত্বটি। যার ইসলামী পরিভাষা جهاد في سبيل الله বা “আল্লাহর পথে পরম সাধনা”, আজকের পৃথিবীতে আমাদের ভাষায় যা ‘ইসলামী আন্দোলন’ হিসেবে পরিচিত। তাই ইসলামী আন্দোলনেরও প্রথম কথা শিখুন, নিজেকে জানুন, স্বীয় স্রষ্টার সাথে পরিচিত হোন যার দিকে সেকেণ্ড, মিনিট, ঘন্ট, দিন করে করে আপনি এগিয়ে যাচ্ছেন, ভাবতে শিখুন আপনার মৃত্যুপরবর্তী অনন্ত জীবন সম্পর্কে, দুনিয়ায় কোথায় আপনার কল্যাণ আর কোন বাঁকে রয়েছে অকল্যাণের অক্টোপাশ লুকিয়ে তা সম্পর্কে সচেতন হোন, কি রেখে যাচ্ছেন আপনার উত্তরসূরীদের জন্য তা পরীক্ষা করুন, বিশ্লেষণ করুন, তার প্রতিদান চিন্তা করুন; সর্বোপরি একজন অন্ধকে নিঃসীম কালো জগত থেকে হাত ধরে তুলে তার দু’চোখের কোঠরে দু’টি সুস্থ সবল মণি লাগিয়ে তাকে এই অতীব সুন্দর ধরাধামের যাবতীয় রূপ-সৌন্দর্য্য দেখানোর মতই ইসলামী আন্দোলনের কর্মী বাহিনী পথভ্রান্ত মানুষকে দেখায় অনন্ত জীবনের আলো, চলতে সাহায্য করে কল্যাণের পথে, হাতে ধরিয়ে দেয় মহাসাফল্য।
এভাবেই অজ্ঞতার অন্ধকার হতে এবং এর দ্বারা পতিত যুলুম-নির্যাতন ভোগ ও তা করা থেকে বিরত রাখতে ইসলামী আন্দোলন সাহায্য করে ও সফল হয়। আর এই সৎকর্মসমূহের নেতৃত্বে রয়েছেন সেই যোগ্য মানুষেরা যাদের সম্পর্কে সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ নবী ও রাসূল বলে গিয়েছেনঃ إن العلماء روثة الأنبياء “অবশ্যই আলেমগণ নবীগণের ওয়ারিস বা উত্তরসূরী।” [তিরমিযীঃ ২৮২৩] অর্থাৎ, আলেমগণ, যাদের কাছ থেকে আমরা নবীরাসূলগণের রেখে যাওয়া আলো পেয়ে থাকি, শিক্ষা পেয়ে থাকি; যা দ্বারা অন্ধকারের যুলুম অত্যাচার থেকে বাঁচতে পারি নিজেরা এবং বাঁচাতে সচেষ্ট হই আপন পরিবার পরিজন ও আত্মীয়-স্বজন এবং মুসলিম উম্মাহকে। এয়াড়াও সর্বসাধারণের উদ্দেশ্যে প্রিয় নবী বলে গেছেনঃ بلغوا عني ولو آية “প্রচার কর, যদি আমার পক্ষ হতে একটি কথাও (তোমার জানা থাকে)।” [তিরমিযীঃ ২৮০৭]। তাই আসুন আল্লাহর বাণী ও তাঁর রাসূলের বাণীসমূহ নিয়ে আমরা পৃথিবীকে কল্যাণের পথ দেখাই, যালেমকে সাহায্য করি তাকে যুলুম করা থেকে বিরত রেখে আর মযলুমকে সাহায্য করি যালেমের বিরুদ্ধে তার সাহায্যকারী হয়ে, কেননা আমাদের প্রিয় রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমন শিক্ষাই রেখে গেছেন আমাদের জন্য। বর্তমানে ইসলামী আন্দোলনই ইসলামের এ সুমহান দায়িত্বভার কাঁধে তুলে নিয়েছে, তাই আমাদের উচিত ইসলামী আন্দোলনে নিজেদেরকে সম্পৃক্ত করে বৃহত্তর উম্মাহর মূল লক্ষ্য বাস্তবায়নে সর্বাত্মক আত্মনিয়োগ করে যালেম ও যুলুমের অবসান ঘটানো। আল্লাহ্ আমাদের তৌফিক দিন।
জানা এবং জেনেও না মানার প্রবণতা
পৃথিবীতে মানুষ যা জানে বা জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে জেনে থাকে, সেসবকে জানার মধ্যে যেমন রয়েছে বিভিন্নতা তেমনি রয়েছে মানার পরিণামের ক্ষেত্রেও বিভিন্নতা। অর্থাৎ, জানার ক্ষেত্রে ভাল-মন্দের অসীম পরিধি যেমন বিস্তৃত তদ্রূপ মানার ক্ষেত্রেও অসামান্য স্বাধীনতা ও সুযোগ রয়েছে; চাই তা হোক প্রকাশ্যে বা একান্তে, অন্যের সাথে অথবা একাকী, জনকল্যাণে কিংবা আপনার স্বার্থে। প্রকৃত কল্যাণোনুসন্ধানী মানুষেরা তাই জানার ব্যাপারেও সর্বদা সর্বোচ্চ প্রাধান্য দিয়ে থাকে সত্য, ভাল ও মঙ্গলময়তাকে আর অসত্য, মন্দ ও অমঙ্গলময়কে জানতে চেষ্টা করে শুধুমাত্র তা থেকে আত্মরক্ষা করার নিমিত্ত।
সুমহান স্রষ্টা মানুষ হতে শুরু করে সকল প্রকার প্রাণীকুলের জন্যই অবারিত করে রেখেছেন প্রকৃতি নামক জগৎব্যাপী শিক্ষালয়; যেখান থেকে জন্মগতভাবেই কিছুটা, তৎপরবর্তী বেড়ে উঠায় কিছুটা, জীবনের পরিপূর্ণতায় কিছুটা এবং বার্ধক্যেও কিছু কিছু করে জ্ঞান লাভ করে থাকে। আর এর মাধ্যমে স্রষ্টা একান্ত নিজ তত্ত্বাবধানেই সুসামঞ্জস্য রাখেন তাঁর সৃজনসমাহারকে। যা আমরা বিশেষভাবে লক্ষ্য করে থাকি অশিক্ষিত বা দুর্গম গ্রামাঞ্চল কিংবা অতীত জাতিসমূহের ইতিহাস থেকে, যেখানে তারা স্রষ্টার সৃজিত প্রকৃতিলব্ধ জ্ঞানার্জনের মাধ্যমে এবং পর্যায়ক্রমিক ধারায় গবেষণার মাধ্যমেই টিকিয়ে রেখেছে ও সুসমৃদ্ধকরণে ভূমিকা রেখেছে এবং আজো রাখছে বিশ্ব সভ্যতাকে বর্তমানের শিখরে পৌঁছাতে। অলঙ্ঘনীয় সত্য যে, আজকের জ্ঞানবিজ্ঞানের উন্নতির প্রারম্ভ যেমন স্রষ্টার সৃষ্ট প্রকৃতি লব্ধ, তেমনি অগ্রগামী সভ্যতা এখনো প্রকৃতির দুয়ারেই কড়া নাড়ছে প্রতিনিয়ত নিজেদের জ্ঞানের রাজ্যের সীমানাকে আরো বিস্তৃত করে তুলতে।
জ্ঞানের অথবা জানার সুবিশাল পরিমণ্ডলে রয়েছে বিবিধ দিক ও বিভাগ। যেমন রয়েছে আত্ম পরিচয় জানা, যেখানে অবস্থান করছে অর্থাৎ, এই পৃথিবীর পরিচয় জানা, আপনাপন দায়িত্ব অর্থাৎ, কেন এই ধরায় আগমন তা সম্পর্কে জানা, স্বীয় কর্মাদি সঠিকভাবে সুসম্পন্ন করার কলাকৌশল সম্পর্কে জানা, সর্বপরি রয়েছে এসব কর্মাদির পরিণাম ফল সম্পর্কে সম্যক অবগত হওয়া। তেমনিভাবে পৃথিবীর বেঁচে থাকা স্বল্পকালীন সময়ে সমাজবদ্ধ জীব মানুষের জন্য রয়েছে অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা, রয়েছে পারস্পরিক মেলামেশা, আদান-প্রদান, ক্রয়-বিক্রয়, আত্মীয়তার সম্পর্ক, সামাজিক রীতিনীতি, রাষ্ট্রীয় বিধানাবলী, আইন-কানুন, অর্থনীতি, শিল্পনীতি, রাজনীতিসহ আন্তর্জাতিক সম্পর্কনীতি। এত সুবিশাল জানার জগতে প্রতিজন মানুষই যে পরিপূর্ণ সুবিজ্ঞতা লাভ করবেন, এমন আশা অস্বাভাবিক, কারণ ক্ষুদ্র থেকে বিশালতাতেই জগৎ সংসারের ভারসাম্যতা; অন্যথা তার বিলুপ্তি অনিবার্য।
তাই মানুষ তার জীবন পরিচালনা করার মত নূন্যতম জ্ঞান লাভ করাকেই যথেষ্ট মনে করা হয়েছে যেমন বিধানদাতার পক্ষ হতে, তেমনি সর্বযুগের সুবিজ্ঞ জ্ঞানী সম্প্রদায়ের নিকটও। ইসলামী জীবন ব্যবস্থায় মানুষের যাবতীয় কর্মাদি এবং সেসবের দুনিয়া ও আখেরাতের পরিণাম সম্পর্কে যতটা সুন্দর, সুসামঞ্জস্যশীল, যুক্তিযুক্ত এবং বিস্তারিত আলোচনা ও বিধানাবলী এসেছে, এমনটি পৃথিবীর আর কোন ধর্ম বা মতবাদে আসেনি; একথা আজকের পৃথিবীতে সর্বজন স্বীকৃত।
আমাদের সমাজে প্রচলিত ‘আলেম’ শব্দটির অর্থ হচ্ছে জ্ঞানী। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে এ শব্দের অর্থের প্রতি গুরুত্ব না দিয়ে ও তার সাথে বাস্তবের মিল না দেখেই দাড়ি, টুপি তথা প্রচলিত ইসলামী পোশাকে সমৃদ্ধ ব্যক্তিবর্গকে আলেম হিসেবে আখ্যা দিয়ে থাকে অনেক সাধারণ মানুষ। অবশ্য এ জাতীয় ভুল অন্যান্য সকল ব্যাপারেই সংঘটিত হয়ে থাকে অহরহ। অন্যদিকে অপর এক পক্ষ ভেবে বসে আছেন যে, শুধুমাত্র মাদ্রাসা শিক্ষিত ব্যক্তিবর্গই আলেম; এর বাইরে কেউ আলেম হতে পারেন না -এ ধারণাও সংকীর্ণতায় সীমাবদ্ধ। বরং মাদ্রাসা শিক্ষিতগণ তো অব্যশই আলেম সন্দেহ নেই, কেননা তাদের শিক্ষা জীবনের ১০ থেকে নিয়ে প্রায় ২৫ বছর যাবৎ আল্লাহর মনোনীত দ্বীন ইসলামের বিভিন্ন দিক ও বিভাগ নিয়েই শিক্ষা ও গবেষণা করেছেন।
কিন্তু সাধারণ শিক্ষিতদের মধ্য থেকেও ইসলামে উল্লেখিত আলেম সৃষ্টি হতে পারে এবং আজকের প্রেক্ষাপটে তার উদাহরণ অন্য সকল সময়ের চাইতে বেশী। আলেম সম্পর্কিত কথাগুলো বলার কারণ এই যে, প্রথমতঃ উল্লেখিত ভুল ধারণা যারা এখনো পোষণ করে যাচ্ছেন, তাদের ক্ষেত্রে তা দূর করা এবং দ্বিতীয়তঃ একথা পরিস্কার করা যে, আত্মপরিচয়, জীবন ও জগত, এখানে আগমনের কারণ ও দায়িত্বসমূহ, সেসব পালন পদ্ধতি এবং সেসবের দুনিয়াবী ও আখেরাতের পরিণাম সম্পর্কে মৌলিক জ্ঞান যার রয়েছে; ইসলামের দৃষ্টিতে সেই আলেম বা সেই যে জ্ঞানী ব্যক্তি তথা আলেম; এ কথা পরিস্কার করা।
তবে পার্থক্য এই যে, জ্ঞানের ক্ষেত্রে যেমন রয়েছে বেশী-কম, বুঝার ক্ষেত্রে যেমন রয়েছে সূক্ষ্মতা ও স্থূলতা, গ্রহণ-বর্জনের ক্ষেত্রে যেমন রয়েছে উদারতা ও সংকীর্ণতা; তেমনি সেসবের ধারকদের অর্থাৎ, সর্বপর্যায়ের আলেম বা জ্ঞানী সম্প্রদায়ের মধ্যেও রয়েছে সুবিজ্ঞ এবং স্বল্পবিজ্ঞতার পার্থক্য, সুবিবেচক এবং অবিবেচকের পার্থক্য। এখানে একথা নিঃসন্দেহ যে, আজকাল যারাই দ্বীনকে বাদ দিয়ে শুধুমাত্র দুনিয়ার জ্ঞানে সমৃদ্ধ তারা ইসলামের ঘোষিত আলেমের মর্যাদা কোনভাবেই পেতে পারেন না, কেননা ইসলামী পরিভাষায় ‘ইলম’ তথা জ্ঞানের পরিধি শুধুমাত্র পৃথিবী ও তার বস্তুনিচয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং পূর্বাপর অনন্ত-অসীমকে পরিবেষ্টিত সে জ্ঞান; তাই তার ধারক বাহকদেরও হওয়া উচিত শুধুমাত্র দুনিয়া কেন্দ্রিকতার অনেক অনেক ঊর্ধ্বে।
যেখানে থাকবে অনিবার্যরূপ বিশ্বাস, বিশ্বাসের বিবিধ আলামত বা উদাহরণ যা স্রষ্টার সৃষ্ট অসীম রহস্যপূর্ণ প্রকৃতিজুড়ে বিস্তৃত, থাকবে অনুধাবন, তাৎপর্যপোলব্দি, থাকবে কর্মচঞ্চলতা, ভালকে গ্রহণ এবং মন্দকে বর্জনের প্রবণতা; সর্বোপরি অনন্ত জীবনবোধের তীব্রতা এবং যাবতীয় কর্মকে সে লক্ষ্যে নিবেদিত করা যাতে তা হতে পারে সকল প্রকার যুলুম-অন্যায়-অবিচারের ঊর্ধ্বে। মূলতঃ জগতজোড়া ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা অসংখ্য জ্ঞানোৎস হতে সত্যিকার এবং দুনিয়া ও আখেরাতের জন্য কল্যাণময় জ্ঞান নির্বাচন করা এবং তাতে সাধনা করার মাধ্যমেই সম্ভব মানুষ তার নিজের, তার স্রষ্টার ও অন্যান্য সৃষ্টির প্রতি যুলুম করা থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখা। সর্বশক্তিমান আল্লাহ্ আমাদের সকল প্রকার যুলুম থেকে রক্ষা করুন।
যালেম এবং মযলুমের মুক্তিতে ইসলামী আন্দোলন
জ্ঞান অনুযায়ী মেনে চলার প্রেক্ষিত
কর্মের সমষ্টিই মানুষের জীবন; কর্ম সম্পাদন তাই মানুষকে ইচ্ছা-অনিচ্ছায় করতেই হয়। আমাদের স্রষ্টা ও প্রতিপালক আল্লাহ্ তা‘আলা আমাদেরকে তাঁর আনুগত্যের প্রশ্নে পরীক্ষা করার নিমিত্ত পৃথিবীর সকল কিছুতেই ভাল ও মন্দ দু’টি ধারার সৃষ্টি করেছেন। আর প্রারম্ভ হতে শুরু করে বর্তমান পর্যন্ত পর্যায়ক্রমিকভাবে তাঁর পক্ষ হতে নবীরাসূলগণ ও আসমানী কিতাবসমূহের মাধ্যমে ভালোর প্রতি আহ্বান এবং মন্দ হতে বেঁচে থাকার আদেশ-উপদেশ দিয়ে এসেছেন; যার বিধানাবলী আজো অপরিবর্তনশীল সত্য হিসেবে বিশ্বময় পরিব্যাপ্ত। সুদীর্ঘ ১৪০০ বছরেরও অধিক কাল যাবৎ পৃথিবীর মানুষ আল্লাহর সর্বশেষ দ্বীন বা মানুষের জন্য পাঠানো জীবন ব্যবস্থা ইসলামকে অনুসরণ করে নিজেদের দুনিয়া ও আখেরাতের জীবনকে সুন্দর ও সমৃদ্ধ করার সুযোগ পাচ্ছে; বরং যুগের পরিবর্তনের সাথে সাথে ইসলামের জ্ঞান গবেষণাও উত্তরাত্তর বৃদ্ধি পেয়েই চলছে; সকল প্রশংসা দয়াময় আল্লাহর।
কর্ম মানুষকে সম্পাদন করতেই হবে, কারণ এটাই তার জীবন, এ জীবনকে পরিচালনা করার বিধানাবলীও প্রস্তুত, কিন্তু সর্বাবস্থায়ই তাকে জানতে হবে। তার জন্য নির্ধারিত জীবন ব্যবস্থা সম্পর্কে ওয়াকিফহাল না হলে সে অন্য কোথাও থেকে অন্য যে কোন কিছুই গ্রহণ করতে পারে; এ স্বাধীনতা তার রয়েছে। তবে এর পরিণামও অত্যন্ত ভয়াবহ, তাই মানুষের উচিত জানার ক্ষেত্রকে যতই বর্ধিত-পরিব্যপ্ত করুক না কেন জীবনের জন্য বাছাই-নির্ধারণের ক্ষেত্রে স্রষ্টাপ্রদত্ত বিধানই নির্ধারণ করা। সুতরাং যে তার প্রতিপালকের পক্ষ হতে প্রাপ্ত জীবন বিধান সম্পর্কে যত বেশী জানতে পারবে, যত বেশী বিজ্ঞতা অর্জন করতে পারবে, তার জন্য তা সত্যিকারের উপলব্ধিসহ মেনে চলাও ততই সহজ হবে।
যা কিছু জানা হয় তার সবটাই মানা হয় না, এ কথা যেমন ঠিক তেমনি সঠিক- জানা না থাকলে মানার প্রশ্নই উঠে না। এই জানা বা জ্ঞানার্জনের ব্যাপারে কোথাও কোথাও দেখা যায় বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়; এটা শুধু একটা নির্দিষ্ট বয়স সীমার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হতে পারে, কিন্তু পূর্ণতায় তা আত্মহত্যার শামিল। তাই আমি বলবো, যেখানে যে জ্ঞানই পাওয়া যায় তাকে ধারণ করুন, তারপর নির্ধারণ করুন আপনার দুনিয়া ও আখেরাতের জন্য কোনটা প্রয়োজনীয় আর কোনটা অপ্রয়োজনীয়; কারণ জ্ঞানের সাথে অতি সাধারণ বুদ্ধিমানও তার ভাল-মন্দ, প্রয়োজন-অপ্রয়োজন বুঝে। অবশ্য একান্ত স্বল্পবিবেচকের কথা ভিন্ন। কিন্তু সর্বদাই সর্বোচ্চ প্রাধান্য দিতে হবে জীবন ও জগতের জন্য সবচেয়ে বেশী প্রয়োজনের আনুপাতিকতাকে। আমাদের স্রষ্টার নির্দেশও তাইঃ فَاسْتَبِقُواْ الْخَيْرَاتِ অর্থাৎ, “তোমরা কল্যাণের দিকে ছুটে যাও।” [সূরা আল-বাকারাঃ ১৪৮]
ইসলাম তার অনুসারীদের প্রতি তার বিধানাবলী মানতে তথা ঈমানের পর সৎকর্মাদি সম্পাদন করাকে সর্বাধিক গুরুত্ব প্রদান করেছে। আর আল্লাহ্ রাব্বুল ‘আলামীন সর্বকালেই তাঁর নবীগণের মাধ্যমে মানুষের প্রতি এ নির্দেশ দান এবং তা পালনের পরিণামে মহাসাফল্য সম্পর্কে সংবাদ পাঠিয়েছেন; যেমনটি তিনি তাঁর বাণী আল-কুরআনে বলেছেনঃ
إِنَّ الَّذِينَ آمَنُواْ وَالَّذِينَ هَادُواْ وَالنَّصَارَى وَالصَّابِئِينَ مَنْ آمَنَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الآخِرِ وَعَمِلَ صَالِحاً فَلَهُمْ أَجْرُهُمْ عِندَ رَبِّهِمْ وَلاَ خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلاَ هُمْ يَحْزَنُونَ
“নিশ্চয়ই যারা ঈমান এনেছে, যারা ইয়াহূদী হয়েছে এবং নাসারা ও সাবি’ঈন যারাই আল্লাহ্ ও আখেরাতের প্রতি ঈমান আনে ও সৎকাজ করে, তাদের জন্য পুরস্কার রয়েছে তাদের রবের কাছে। তাদের কোন ভয় নেই এবং তারা চিন্তিতও হবে না।” [সূরা আল-বাকারাঃ ৬২] কর্ম তো যে কোনভাবে, যে কোন পন্থায় মানুষ হিসেবে আমাদেরকে সম্পাদন করতেই হবে; তাহলে ভাবুন তো তারা কত সৌভাগ্যবান যারা তাদের দুনিয়ার জীবনের দৈনন্দিন কর্মাদি সম্পাদন করে যাবে, সাথে যোগ করবে শুধু ঈমান তথা আল্লাহর তাওহীদে পরিপূর্ণ বিশ্বাস এবং তাঁরই দেয়া জীবন বিধান-যার অনুসরণ না করলেও ব্যক্তি কোন না কোন বিধানের অনুসরণ করতোই-অতএব তার জন্য রয়েছে পৃথিবী এবং অনন্ত জীবন মিলিয়ে তার প্রভুর নিকট মহা পুরস্কার, রয়েছে নির্ভয়তা এবং রয়েছে দুঃচিন্তাহীনতা। আয়াতে উল্লেখিত ‘পুরস্কার’, ‘ভয়’ এবং ‘চিন্তা’ শব্দগুলো এমনি অর্থবহ এখানে; যা আখেরাত সম্পর্কে নূন্যতম জ্ঞান রাখা ব্যক্তি মাত্রই গভীর উপলব্ধি করতে সক্ষম। যে উপলব্ধি মানুষকে সর্বপ্রকার যুলুমের হাত থেকে বাঁচতে সহায়তা করতে সক্ষম।
বিধান ও প্রেরিত পুরুষদের সাথে কৃত আচরণে মানুষের প্রকারভেদ
মানুষের স্রষ্টা আল্লাহ্ তাঁর বান্দাদের জীবন পরিচালনার জন্য বিধান পাঠিয়েছেন যুগে যুগে; একথা আমরা পূর্বেই জেনেছি। পৃথিবীর প্রথম মানুষ কিংবা ক্ষণকাল পূর্বে জন্ম নেয়া শিশুটি; পৃথিবীতে তারা কিভাবে তাদের জীবনকাল কাটাবে, সে সম্পর্কে কেউই কিন্তু তাদের প্রতিপালকের নিকট কোন প্রশ্ন উত্থাপন করেনি। এক্ষেত্রে দয়াময় আল্লাহ্ তাঁর “রব” বা প্রতিপালক গুণের মহিমায় আমাদের জন্য না চাইতেই শুধু যে বিধানের ব্যবস্থা করেছেন তাই নয়; বরং কিভাবে সেসব বিধিবিধানকে আমরা পালন করবো তা শিক্ষা দেয়ার জন্য শিক্ষকস্বরূপ অসংখ্য নবী-রাসূল(‘আলাইহিমুস্ সালাম)কেও প্রেরণ করেছেন। অথচ স্বল্প জ্ঞান ধারণকারী, ভবিষ্যত দেখতে অক্ষম, দুর্বলচিত্ত, অধৈর্য, অকৃতজ্ঞ ইত্যাদি ক্ষীণতায় হীন মানব সম্প্রদায়ের অধিকাংশই আল্লাহর বিধান ও সেসব শিক্ষা দেয়ার জন্য তাঁর পক্ষ হতে প্রেরিত শিক্ষকগণের সাথে অত্যন্ত অযাচিত ব্যবহার করেছে। কি নির্বোধ তারা, যারা এত মহামূল্যবান দানকে পেয়েও তা ধারণ করে নিতে পারেনি; বরং তার সাথে করেছে অবজ্ঞা ও প্রত্যাখ্যানমূলক আচরণ। চিন্তার প্রসারণে তারা যে নিজেদেরকেই ঠকিয়েছে, নিজেদের উপরই যুলুম করেছে এবং নিজেদেরই দুনিয়া ও আখেরাতকে আপনাপন হাতে জ্বালিয়ে ছাইভষ্ম করে দিয়েছে; একথা আল্লাহর হেদায়াতপ্রাপ্ত প্রতিজন মানুষই বুঝতে সক্ষম। শুধুমাত্র তারা ব্যতীত, যাদের উল্লেখ উপরে করা হয়েছে। অবশ্য মৃত্যুদূত এসে তাদের জীবনের দরজায় কড়া নাড়ার সাথে সাথে তারাও সবকিছু বুঝতে ও উপলব্ধি করতে সক্ষম হবে; কিন্তু তখন তার জন্য ফিরে আসার সকল কপাট বন্ধ হয়ে যাবে চিরদিনের তরে। (আমাদেরকে এমন দুর্ভাগ্য হতে হেফাযত করুন হে দয়াময়!)
আল্লাহর বিধান নিয়ে যুগে যুগে মানব জাতির প্রতি তাঁর প্রেরিত পুরুষগণ যখনি আগমন করেছেন, তখন তাদের সাথে আচরণের প্রেক্ষিতে ও তাদের কথা তথা তাদের রব আল্লাহ্ তা‘আলার কথা শোনা, মেনে নেয়া ও সে অনুযায়ী জীবনাচরণের ক্ষেত্রে মানবজাতি কয়েকটি ভাবে বিভক্ত হয়েছে। নবীর অবস্থান বর্তমান থেকে তার অবর্তমান নিয়ে আজ অবধি তাদের মধ্যকার বিভক্তিগুলো নিম্নে তুলে ধরার প্রয়াসী হলাম-
১) শুনলাম, মেনে নিলাম, বুঝলাম, হক আদায় করে আমল করছি।
এ পর্যায়ে অবস্থান করছেন আল্লাহর প্রিয় বান্দাগণ, যারা তাঁর আদেশ শোনা মাত্রই কোন রূপ দ্বিধাদ্বন্ধ ছাড়াই অবনত মস্তকে ও সন্তুষ্ট চিত্তে তা গ্রহণ করে নেয়, সে সম্পর্কে সর্বোচ্চ প্রচেষ্টার মাধ্যমে জ্ঞান অর্জন করে এবং ইবাদাতের পরিপূর্ণ হক আদায় প্রতিপালকের বিধানাবলীর বাস্তবায়নে জীবনজোড়া সাধনায় লিপ্ত হয়। এরা একাধারে সিদ্দীক, আলেম, আবেদ ও দায়ী ইলাল্লাহ অর্থাৎ, আল্লাহর পথে আহ্বানকারীও। যাদের প্রসঙ্গে আল্লাহ্ তা‘আলা পবিত্র কুরআনুল কারীমে বলেছেনঃ قَالُواْ سَمِعْنَا وَأَطَعْنَا “তারা বলেঃ আমরা শুনেছি ও মেনে নিয়েছি।” [সূরা আল-বাকারাহঃ ২৮৫] উল্লেখিত আয়াতংশটি সম্পর্কে তাফসীরবিদ ইবনে কাসীর রাহিমাহুল্লাহ্ বলেনঃ ‘তারা বলে, হে প্রভু, আপনার কালাম শুনেছি, তা বুঝেছি, তার উপর স্থির রয়েছি এবং সে অনুযায়ী আমল করছি’।
২) শুনলাম, মেনে নিলাম, বুঝলাম, অবহেলা ও যথাসাধ্যতা মিলিয়ে আমল করছিঃ
এ পর্যায়ে সাধারণ আলেম বা জ্ঞানীগণ রয়েছেন, যারা শুনেন, আন্তরিকভাবেই মেনে নেন, যথাসাধ্য জ্ঞান লাভের প্রচেষ্টা চালান এবং জ্ঞানানুযায়ী আমলও করেন। কিন্তু আত্মিক, ঈমানী দুর্বলতা অথবা শয়তানের প্ররোচণার মোকাবেলায় প্রতিরোধী চেতনা থেকে বিচ্যুত হবার কারণসহ আরো অন্যান্য কারণে ইবাদাত সাধনায় অবহেলায় পতিত হন। মোটের বিচারে তারা অবশ্যই প্রথম শ্রেণীর কাছাকাছি সালেহীন বা সৎকর্মপরায়ণ। তবে যারা যত বেশী মজবুত তারা তত বেশী নিকটবর্তী হবেন প্রথম পর্যায়ের, বিপরীতে অধিক দুর্বল ঈমানদারগণ থাকবেন নিম্নপর্যায়ে। এ প্রসঙ্গে সূরা ফাতির-এর ৩২ নং আয়াত দ্রষ্টব্য; যা পরে উল্লেখ করা হলো।
৩) শুনলাম, মেনে নিলাম, বুঝলাম কম, অধিক আমল করছিঃ
এ পর্যায়ে অবস্থানকৃতদের পারিভাষিক নাম ‘আবেদ বা ইবাদাতকারী। আমাদের চারপাশে তাকালে দ্বীনী বা ধার্মিক ব্যক্তিবর্র্গের মধ্যে অধিকাংশকেই এই পর্যায়ে ফেলা যায়, যারা জীবনের শুরুতে অথবা পরবর্তী বিভিন্ন পর্যায়ে মৌলিক ইবাদাত সম্পাদনের পন্থাসহ কিছু কিছু অতি প্রয়োজনীয় বিধিবিধান সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করেছেন এবং সেসবকে পুঁজি করে অধিক পরিমাণে নেক আমল করে আল্লাহর প্রিয়ভাজন হবার সাধনা করে যাচ্ছেন।
মোটের উপর প্রথম ও দ্বিতীয় পর্যায়ের অধিক সৎকর্মপরায়ণ শ্রেণীর সাথে এই শ্রেণীর পার্থক্য হচ্ছে আলেম ও আবেদ-এর। অর্থাৎ, একজন আলেম একই সাথে আবেদও কিন্তু একজন আবেদ ইবাদাতের পন্থা-পদ্ধতিই শুধু জানেন; পরিপূর্ণ আলেম তিনি নন।
৪) শুনলাম, অস্বীকার করলাম না, বুঝলাম কম, ইচ্ছেনুযায়ী আমল করছিঃ
একান্ত সাধারণ মুসলমানগণের মধ্যে যারা দ্বীনমুখী, তারা এ পর্যায়ে শামিল। কেননা, অস্বীকার করার প্রবণতাই মানুষকে দ্বীন থেকে বহিস্কার করতে সহযোগিতা করে। অথচ এ শ্রেণীর মধ্যে তা নেই, তাই এদের নিকট দ্বীনকে সুন্দর ও প্রচ্ছন্নভাবে তুলে ধরতে পারলে আশা করা যায় যে, তারা প্রথম ও দ্বিতীয় অথবা তৃতীয় পর্যায়ে বা তাদের কাছাকাছি পৌঁছুতে সক্ষম হবে। তাই দা‘য়ীদের উচিত তাদের দাওয়াতী টার্গেটে এ পর্যায়টিকে বিশেষ গুরুত্ব প্রদান করা।
উপরোল্লেখিত বিভাগগুলো কুরআনের বিভাজনে তিনটি ভাগেও নিয়ে আসতে পারি, যেমন আল্লাহ্ তা‘আলা বলেনঃ
ثُمَّ أَوْرَثْنَا الْكِتَابَ الَّذِينَ اصْطَفَيْنَا مِنْ عِبَادِنَا فَمِنْهُمْ ظَالِمٌ لِنَفْسِهِ وَمِنْهُمْ مُقْتَصِدٌ وَمِنْهُمْ سَابِقٌ بِالْخَيْرَاتِ بِإِذْنِ اللَّهِ ذَلِكَ هُوَ الْفَضْلُ الْكَبِيرُ.
অর্থাৎ, “তারপর আমি কিতাবের অধিকারী করলাম আমার বান্দাদের মধ্য থেকে যাদেরকে আমি মনোনীত করেছি; তবে তাদের কেউ নিজের প্রতি অত্যাচারী, কেউ মধ্যমপন্থী এবং কেউ আল্লাহ্র ইচ্ছায় কল্যাণের কাজে অগ্রগামী। এটাই মহাঅনুগ্রহ।” [সূরা ফাতিরঃ ৩২] এ আয়াতের তাফসীর প্রসঙ্গে আল্লামা ইবনে কাসীর বলেনঃ
১) فَمِنْهُمْ ظَالِمٌ لِنَفْسِهِ অর্থাৎ, তাদের একদল কোন কোন ফরয কাজে ত্র“টি করল এবং কোন কোন হারাম কাজে জড়িয়ে পড়ল।
২) وَمِنْهُمْ مُقْتَصِدٌ অর্থাৎ, অপর দল ফরযগুলো আদায় করল ও হারামসমূহ বর্জন করল। কিন্তু তারা বেশ কিছু মুস্তাহাব ছেড়ে দিল ও বেশ কিছু মাকরূহ কাজ সম্পন্ন করল।
৩) وَمِنْهُمْ سَابِقٌ بِالْخَيْرَاتِ بِإِذْنِ اللَّهِ অর্থাৎ, তৃতীয় দলটি ফরয, ওয়াজিব, সুন্নাত ও মুস্তাহাব আদায় করল এবং হারাম ও মকরূহ কার্যাবলী বর্জন করল। এমনকি অনেক মোবাহ কাজও বর্জন করল।
৫) শুনলাম, কিছু মানলাম আর কিছু মানলাম না, বুঝার চেষ্টাও তেমন করিনি, রসম-রেওয়াজের মতই কিছু আমল করছিঃ
একজন মুসলমানের জন্য এ পর্যায়টি অত্যন্ত ক্ষতিকর, কেননা সে তাগূতও নয়, কাফেরও নয়, মুশরিকও নয় এমনকি মুনাফেকও নয়; অথচ এমন এক নাজুক অবস্থানে অবস্থান করছে যে, এখান থেকে যেকোন মুহূর্তে পা পিছলে কোন ভয়াবহ পর্যায়ে পড়ে যেতে পারে। কেননা, মানা-না মানার ব্যাপারে সে রয়েছে সীমাহীন দ্বিধাদ্বন্ধের অন্ধকারে, বুঝার ক্ষেত্রেও তার অবহেলা অপরিসীম, পরন্তু বাপদাদাকে পালন করতে দেখে এসেছে তাই সেও নিতান্ত সামাজিক অনুষ্ঠানাদি বিবেচনাতেই ধর্মীয় বিধিবিধানের যৎকিঞ্চিত পালন করে যাচ্ছে; অথচ একজন প্রথম শ্রেণীর মুসলমান কেমন হওয়া উচিত এবং সে কোথায়, এসব নিয়ে চিন্তা করার তার নিকট তেমন কোন গুরুত্বই পায় না। তাই এই পর্যায়ভুক্তদের ব্যাপারে সবকিছুতেই সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত। এরাই গাফেল, কুরআনুল কারীমে আল্লাহ্ রোমকগণের উদ্বৃতি দিয়ে এ পর্যায়ের গাফেলদের স্বরূপ বর্ণনা করে বলেনঃ
يَعْلَمُونَ ظَاهِراً مِنَ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَهُمْ عَنِ الْآخِرَةِ هُمْ غَافِلُونَ. [الروم:৭]
অর্থাৎ, “ওরা পার্থিব জীবনের বাহ্য দিক সম্বন্ধে অবগত, আর আখিরাত সম্বন্ধে গাফেল।” [সূরা র্আ-রূমঃ ৭]
৬) শুনলাম, মেনে নেয়ার ব্যাপারে খুব সতর্ক হলাম না, বুঝলাম উল্টো বা তেমন চেষ্টা করিনি, এক আল্লাহর সাথে আরো অসংখ্য ইলাহ্ ও রবের ইবাদাত করছিঃ
নাম পরিচয়ে মুসলমান হলেও এই শ্রেণী মূলতঃ মুশরিক অর্থাৎ, অংশীবাদী। যদিও তারা স্বীকার করে যে, তারা এক আল্লাহয় বিশ্বাসী, দ্বীন ইসলামের অনুসারী, মুসলিম উম্মাহর অন্তর্ভুক্ত; কিন্তু আল্লাহর কুরআন ও রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের সহীহ্ হাদীসের বিচারে তারা প্রত্যেকেই স্বল্প-বিস্তর শির্কে নিমজ্জিত। চাই তা হোক বিশ্বাসে, কথায়, কর্মে অথবা সমর্থনে কিংবা বিভিন্ন প্রকার নযর-মান্নত, দান-সদকা, দো‘আ-যিয়ারত ইত্যাদিতে। অন্তরের কথা তো প্রকাশ না করা পর্যন্ত অন্তর্যামীই ভাল জানেন, কিন্তু কথায়, সমর্থনে এবং কর্মে তাদেরকে পাওয়া যাবে প্রার্থনা করা হয় এমন কবরগুলোর আশপাশে, মাযারে মাযারে, অধিকাংশ পীরের আস্তানায়, আরো পাওয়া যাবে প্রভাব-প্রতিপত্তিশালীদের অফিসে-বৈঠকখানায়, এমনকি নবী ও সাহাবীগণের কবরের আশপাশেও। এদের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে স্পষ্ট ঘোষণাঃ
إِنَّ اللّهَ لاَ يَغْفِرُ أَن يُشْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا دُونَ ذَلِكَ لِمَن يَشَاءُ وَمَن يُشْرِكْ بِاللّهِ فَقَدِ افْتَرَى إِثْماً عَظِيماً. [النساء : ৪৮]
অর্থাৎ, “নিশ্চয়ই আল্লাহ্ তাঁর সাথে শরীক করাকে ক্ষমা করেন না। এছাড়া অন্যান্য অপরাধ যাকে ইচ্ছে ক্ষমা করেন। আর যে-ই আল্লাহ্র সাথে শরীক করে, সে এক মহাপাপ করে।” [সূরা আন্-নিসাঃ ৪৮]
৭) শুনলাম, মনে মনে মানলাম না, বুঝলাম উল্টো, লোক দেখানো আমল করলামঃ
ইসলামের পরিভাষায় এরাই মুনাফিক হিসেবে খ্যাত। প্রকাশ্য শত্র“র চাইতে এই আস্তিনের সাপগুলোই ইসলামের সবচেয়ে বেশী ক্ষতি করেছে এবং আজো করে চলছে। এরা সকল নবীর যুগেই ছিল, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের সময়ও ছিল; যাদের নেতৃত্বে ছিল তৎকালীন মদীনার আব্দুল্লাহ্ বিন উবাই। তার অনুসারীরা আজো মুসলমানদের মাঝে বর্তমান, ভবিষ্যতেও থাকবে। কখনো কখনো এরা জেনেশুনেই জাগতিক স্বার্থের লোভে এই পর্যায়ে শামিল হয় আবার কখনো কখনো অজান্তেই চিন্তা-বিশ্বাস ও কর্মের দ্বারা মুনাফিকদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়, যা মূলতঃ তাদের সত্তার সাথেই সংশ্লিষ্টতা রাখে। এ পর্যায়েও রয়েছে তীব্রতার ভয়াবহতা থেকে শুরু করে মুমিন হয়েও কখনো কখনো রিয়া বা এ জাতীয় অন্যান্য উপসর্গের কবলে পতিত হওয়ার মত বিভিন্নতা। তবে একজন মুমিনের জন্য এ প্রশ্ন মনে-মননে সর্বদাই জাগুরক রাখতে হবে যে, “আমি কোথাও কোন কাজে বিন্দু পরিমাণ মুনাফেকীতে লিপ্ত হইনি তো?” যেমনটি ভাবতেন এমনকি অনুশোচনার তীব্রতায় প্রকাশ্যে ঘোষণাও দিয়ে ফেলতেন আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবীগণ। “একদা সাবাহী হানযালা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের দরবার থেকে আখেরাতের সম্পর্কিত আলোচনা শুনে নিজ বাড়ী ফিরে যখন পুত্র-কন্যাদের সাথে মিলিত হলেন, স্ত্রীর সাথে কথাবার্তা বললেন এবং উপলব্ধি করলেন যে, তার অন্তরের অবস্থার পরিবর্তন হয়ে গেল। অর্থাৎ, আখেরাতের আলোচনা শুনার পর অন্তরে যে তাকওয়ার ভাবধারা বর্তমান ছিল, তা এখন আর নাই। তৎক্ষণাৎ তিনি বলে উঠলেন যে, ‘হানযালা, তুমি মুনাফেক হয়ে গেছ’। একথা তিনি আবু বকর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুকেও জানালে তিনি বললেনঃ ‘এমনটি তো আমারো হয়’। অবশেষে উভয়ে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট গিয়ে ঘটনা বললেন। শুনে তিনি বললেনঃ যাঁর হাতে আমার প্রাণ, তাঁর শপথ, সর্বদা যদি তোমাদের ঐ অবস্থা থাকত, তবে ফিরিশ্তাগণ তোমাদের সাথে মুসাফাহা করত তোমাদের বিছানায়, তোমাদের চলার পথে। কিন্তু হানযালা, কথা এই যে, সময় সময় তোমাদের ঐরূপ হওয়া উচিত।” (সরাসরি নয়; হাদীসের ভাবটুকু তুলে ধরা হলো) [দেখুন- সহীহ্ মুসলিমঃ ৪৯৩৭] আল্লাহ্ সকল মুমিনকে হেফাযত করুন এ ঘৃণ্যতর নিকৃষ্ট পর্যায় হতে যার শাস্তি হলো জাহান্নামের সর্বনিম্নস্তর। যেমনটি আল্লাহ্ তা‘আলা বলেছেনঃ
إِنَّ الْمُنَافِقِينَ فِي الدَّرْكِ الأَسْفَلِ مِنَ النَّارِ. [النساء : ১৪৫]
অর্থাৎ, “মুনাফেকরাতো জাহান্নামের নিুতম স্তরে থাকবে।” [সূরা আন্-নিসাঃ ১৪৫]
৮) শুনলাম, প্রকাশ্য অস্বীকার করলাম, বুঝলাম উল্টো, আমল করার প্রশ্নই আসে নাঃ
এরাই কাফের সম্প্রদায় এবং এদের সাথে মুসলিম উম্মাহর দূরতমও কোন সম্পর্ক নেই। এদের সাথে বন্ধুত্ব করাকে আল্লাহ তাঁর বান্দাদের হারাম ঘোষণা করেছেন। তিনি বলেনঃ
لاَّ يَتَّخِذِ الْمُؤْمِنُونَ الْكَافِرِينَ أَوْلِيَاء مِن دُوْنِ الْمُؤْمِنِينَ وَمَن يَفْعَلْ ذَلِكَ فَلَيْسَ مِنَ اللّهِ فِي شَيْءٍ إِلاَّ أَن تَتَّقُواْ مِنْهُمْ تُقَاةً. [آل عمران : ২৮]
অর্থাৎ, “মুমিনগণ যেন মুমিনগণ ছাড়া কাফেরদেরক বন্ধুরূপে গ্রহণ না করে। যে কেউ এরূপ করবে তার সাথে আল্লাহ্্র কোন সম্পর্ক থাকবে না; তবে ব্যতিক্রম, যদি তোমরা তাদের নিকট থেকে আত্মরক্ষার জন্য সতর্কতা অবলম্বন কর।” [সূরা আলে-ইমরানঃ ২৮] কেননা, এরা কখনো মুমিনদের বন্ধু হতে পারে না। কখনো কখনো মুসলমান সমাজের অন্তর্ভুক্ত হয়েও অনেকে কাফের হয়ে যেতে পারে, অবশ্য প্রকাশ্য ঘোষণার প্রেক্ষিতেই তা হতে হবে; তখন তাদের সাথেও অনুরূপ আচরণ বাঞ্ছনীয়, অর্থাৎ, তারা আর মুমিনদের বন্ধুত্বের সীমানায় থাকলো না। তবে কথায় কথায় যে কাউকে কাফের ডাকা ঠিক নয়, কারণ এ ব্যাপারে প্রিয় রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম কঠোর ভাবে নিষেধ করেছেন। তিনি বলেনঃ “কেউ তার ভাইকে কাফের বললে তা এ দু’জনের যে কোন একজনের উপর বর্তায়। সে যাকে কাফের বলেছে, যদি সে সত্য সত্যই কাফের হয়ে থাকে, তাহলে তো ঠিকই বলেছে। অন্যথায় কুফরী তার নিজের দিকেই প্রত্যাবর্তন করবে।” [মুত্তাফাকুন ‘আলাইহি, বুখারীঃ ৬১০, মুসলিমঃ ৬০]
৯) শুনলাম, প্রকাশ্য অস্বীকার করলাম, বুঝলাম উল্টো, আমল করার পরিবর্তে বিরোধিতা করলামঃ
ইসলামের বিরুদ্ধাচরণে এ পর্যায়টি সবচেয়ে কঠোর ভূমিকায় অবতীর্ণ রয়েছে; যাদেরকে বলা হয় তাগূত অর্থাৎ, যে কি না শুধুমাত্র নিজে নিজে অস্বীকার করেই ক্ষান্ত রয়নি; বরং অন্যদেরকে ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় নেয়া থেকে সর্বশক্তি প্রয়োগ করে বিরত রাখার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত। এরা পারিবারিক গণ্ডিতে শক্তিমান কোন সদস্য হতে পারে, কিন্তু এদের অধিকাংশকেই পাওয়া যায় রাষ্ট্রশক্তি ও তার ছত্রছায়ায় যারা রয়েছে অর্থাৎ, জিলা, থানা, ইউনিয়ন ও গ্রাম প্রধান ইত্যাদি পর্যায়ে। আরো পাওয়া যায় সমাজ, এলাকা ও দেশ থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক পর্যায়ব্যাপী বিভিন্ন সংগঠন, দল, সমিতি, সেবামূলক সংস্থা ইত্যাদির আড়ালে। এদের মধ্যে যার নাম পবিত্র কুরআন বেশী উল্লেখ করেছে, অন্য কথায় তাদের নেতৃত্বে যে রয়েছে তার উল্লেখ কুরআনের বিভিন্ন স্থানে এসেছে এভাবেঃ
اذْهَبْ إِلَى فِرْعَوْنَ إِنَّهُ طَغَى. [طه : ২৪, ৪৩, النازعات : ১৭]
অর্থাৎ, “ফির‘আওনের কাছে যাও, সে তো সীমালংঘন করেছে।” [দেখুন- সূরা ত্বহাঃ ২৪, ৪৩, সূরা আন্-নাযি‘আতঃ ১৭]
সর্বোপরি অস্বীকার; তা যে কোন পর্যায়েরই হোক না কেন, মুমিনগণের এক্ষেত্রে মূসা ‘আলাইহিস্ সালামের সম্প্রদায়ের লোকেদের ঘটনা থেকে শিক্ষা নেয়া উচিত যার বর্ণনা কুরআনে এসেছে এভাবেঃ
وَإِذْ أَخَذْنَا مِيثَاقَكُمْ وَرَفَعْنَا فَوْقَكُمُ الطُّورَ خُذُواْ مَا آتَيْنَاكُم بِقُوَّةٍ وَاسْمَعُواْ قَالُواْ سَمِعْنَا وَعَصَيْنَا وَأُشْرِبُواْ فِي قُلُوبِهِمُ الْعِجْلَ بِكُفْرِهِمْ. [البقرة : ৯৩]
অর্থাৎ, “স্মরণ কর, যখন তোমাদের প্রতিশ্র“তি নিয়েছিলাম এবং তূরকে তোমাদের উপর উত্তোলন করেছিলাম, (ও বলেছিলামঃ) ‘যা দিলাম দৃঢ়ভাবে গ্রহণ কর এবং শোন’। তারা বলেছিল, ‘আমরা শুনলাম ও অমান্য করলাম’। কুফরীর কারণে তাদের অন্তরে গো-বৎসপ্রীতি ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছিল।” [সূরা আল-বাকারাহঃ ৯৩] ঈমানের পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে গেল সে জাতির বিধান অমান্যকারী লোকেরা। পরিশেষে বলা কথার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ যা তা হলো, প্রতিজন মুমিনেরই আত্মসমালোচনা করা উচিত যে, উল্লেখিত পর্যায়গুলোর মধ্যে তার অবস্থান কোথায়? সে কি রয়েছে প্রথম শ্রেণীর ঈমানদারের পর্যায়ে? না কি অবহেলার অক্টোপাশ তাকে ঘিরে নিয়েছে? না কি পতিত হয়েছে আধুনিক শির্কে? না কি গোপনে তার অন্তরে বাসা বেঁধেছে নিফাকের বিধ্বংসী ঘুণপোকা? অথবা তার সত্তার কোথায় অজান্তে লুকিয়ে রয়েছে ‘কুফর’ বা অস্বীকার নামক কুখ্যাত ডাকাত? কিংবা চুরি হয়ে গেছে তার অন্তর, অথচ সে জানতেও পারেনি; আর সে চোরের নাম ‘তাগূত’! আল্লাহর কথাই হোক এ লেখার আহ্বানঃ يَا أَيُّهَا الْأِنْسَانُ مَا غَرَّكَ بِرَبِّكَ الْكَرِيمِ. “হে মানুষ! কিসে তোমাকে তোমার মহান প্রতিপালক সম্বন্ধে বিভ্রান্ত করল?” [সূরা আল-ইনফিতারঃ ৬] অথবা فَأَيْنَ تَذْهَبُونَ “অতএব, তোমরা কোথায় চলেছ?” [সূরা আত্-তাকভীরঃ ২৬] ……….?



০ জন অতিথি মতামত দিয়েছেন " ইসলামী আন্দোলন " লেখাটিতে।
comment rss যুক্ত করুন অথবা Trackback করুন।লেখাটি সম্পর্কে মতামত রাখুন