কিছু সাধারণ কথা:
ব্যবধান যেখানে, তা হচ্ছে দৃষ্টিভঙ্গির। কারো দৃষ্টিতে মুসলমানদের জাগতিক সাফল্য ও ব্যর্থতা খুব বড় ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঠেকেছে, তাই সে ব্যক্তি এটাকেই ইসলামের মূল বা সর্বাধিক গুরুত্ব দেয়ার মত কাজ হিসেবে বিবেচনা করেছে।
আবার কারো দৃষ্টিভঙ্গি এমন যে, দুনিয়ার অতশত প্যাঁচে না পড়ে খুব সহজে জান্নাত লাভ করা যায় কি করে তার অনুসন্ধান করা এবং সে মত আমল (ইবাদাত) করে দুনিয়ার জীবন পার করে দেয়া।
আরেকটি পেছন থেকে বলতে গেলে আমার মতে, মুসলমানদের মধ্যকার দলাদলির কারণগুলো অনেকটা দৃষ্টিভঙ্গি সৃষ্ট।
সেজন্য প্রাথমিক কথা বলতে গেলে আমি বুঝাতে চেষ্টা করি যে, জীবনের জন্য সবচেয়ে সবচেয়ে বেশী প্রয়োজন যে জিনিসটি এবং যার অভাবে কয়েক মিনিটের মধ্যেই আমরা জীবন ত্যাগ করবো(নিঃশ্বাস বা অক্সিজেন); তার ব্যাপারে সর্বাধিক সতর্ক হওয়া যেমন আমাদের উচিত এবং তারপর পরবর্তী পর্যায়ের (খাদ্য-পানীয়), তারপর তৎপরবর্তী পর্যায়(অন্যান্য মৌলিক প্রয়োজনগুলো) সম্পর্কে সতর্ক থাকা। ঠিক তেমনি করে ঈমান বা মুসলমানিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য কোন জিনিসটি সর্বাধিক গুরুত্বের দাবী রাখে; যার একটু এদিক ওদিক হলে ইসলাম থেকে বের হয়ে যাবে মুসলমান (আকীদার বিষয়গুলোতে কুফরী বা শির্ক করা), তারপর কি(কবীরা গোনাহ্), তারপর কি(সগীরা গোনাহ্) ইত্যাদি বিষয়ে সতর্ক থাকা। এবং পুরো ব্যাপারটা হতে হবে পর্যায়ক্রমিক।
এর ব্যতিক্রমতার কারণে দেখা যায় কেউ কেউ নামাযে হাত তোলা হলো কি হলো না এ নিয়ে জিহাদ ঘোষণা করে বসে অথবা অপেক্ষাকৃত নামাযীর চাইতে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীকে নিকটজন মনে করে ইত্যাদি।
এখন আসি জ্ঞানী ও শিক্ষিতের প্রসঙ্গে: কে পারবেন নিজে বেঁচে থাকতে এবং অন্যদেরকে বাঁচিয়ে রাখতে ঈমান বিনষ্টকারী তেমন প্রত্যেকটি বিষয় হতে যার এক চুল এদিক ওদিক হলে মুসলিম তা মুসলমানিত্ব হারাবে; যদিও সমাজে সে মৃত্যু পর্যন্তও ‘মুসলিম’ হিসেবে পরিচিতি পাবে। একজন আবেদ (যিনি জান্নাতে যাবার জন্য প্রয়োজনীয় ইবাতাত শিক্ষা করেছেন শুধু) কি পারবেন উপরোল্লেখিত ভয়ংকর পরিণতি থেকে নিজেকে এবং মুসলমানদেরকে বাঁচাতে? না, পারবেন না। বরং পারবেন আলেম। তাই হাদীসে একজন আলেম ও একজন আবেদের মধ্যকার পার্থক্য করা হয়েছে আল্লাহর নবী ও একজন সাধারণ মুসলমানের পার্থক্যের অনুরূপ।
ফিরে যাই দৃষ্টিভঙ্গিগত পার্থক্যে: দুনিয়ায় মুসলমানগণ পিছিয়ে আছি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে, মার খাচ্ছি প্রতিনিয়ত, তথাপি এসবের শেষ পরিণাম কি? মৃত্যুই তো, তাই না? সুতরাং মৃত্যুতে সাফল্য লাভ করলো কে; সেটাই প্রধান বিবেচ্য হওয়া উচিত মুসলমানের জন্য। তাই মোটের উপর দু’দিক থেকে বিবেচনা করলে মুসলমানকে দ্বীনী জ্ঞান/শিক্ষাকেই প্রাধান্য দিতে হবে দুনিয়ার জ্ঞান/শিক্ষার চাইতে। তদুপরি মুসলমানগণ যদি দুনিয়ার যাবতীয় প্রযুক্তির ধারক হতো, তবে কি তাদের আখেরাতের সাফল্যে আরো সংযোগ কিংবা প্রাবল্য আসতো কি না সে ব্যাপারেও অনেক কথা রয়েছে। কেননা, শত্রুরা কিন্তু মুসলমানদেরকে দুর্বল করার জন্য যে কয়টি অস্ত্র ব্যবহার করে তার মধ্যে একটি হলো প্রচুর অর্থ এবং বিলাসী সামগ্রী। তাছাড়া বর্তমানের ধনী মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর সাথে গরীব মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর মুসলমানদের দ্বীনী মানগত দিকটি তুলনা করলেও এ প্রসঙ্গের অনেক উত্তর বেরিয়ে আসবে।
সর্বোপরি আসি ‘সবাইকেই কি আলেম হতে হবে’-এ প্রসঙ্গে। হতে চাইলেও সবাই কি তা পারবে? তবে উচ্চমানের আলেম তো কিছু সংখ্যকই হবেন। কিন্তু সাধারণের নূন্যতম এতটা জ্ঞান থাকা সবারই দরকার, যার দ্বারা সে আল্লাহর দফতরে নিজেকে মুসলমান হিসেবে টিকিয়ে রাখতে পারবে অন্তত। অথচ বাস্তবতা কি? মুসলিম দেশের প্রেসিডেন্টরা গিয়ে মূর্খ-ধূর্ত ‘পীর’দের (সত্যপন্থীরা ছাড়া) মাঝারে মাথা ঠুকে মরে। দেশের কর্ণধারদের যেখানে এ দুর্দশা সেখানে উভয় দিকের (দ্বীনী জ্ঞান ও দুনিয়াব জ্ঞান) ভারসাম্য রক্ষার তাগিদে যদি দ্বীনী দিকটাকে একটু বেশী প্রাধান্য দেয়া হয়, তবে সে প্রস্তাবকে বর্তমান সময়ের দাবীতে উড়িয়ে দেয়া যাবে না।
মোদ্দাকথা, শুরুতে যা বলেছিলাম- আমাদেরকে দ্বীন এবং দুনিয়া উভয় জ্ঞানের মধ্যে একটা ধারাবাহিকতা আনতে হবে এবং সেখানে নির্ধারণ করতে হবে উভয়ের সমষ্টি থেকে কোনটি সর্বোচ্চ প্রাধান্য পাবার দাবীদার, তারপর কোনটি, তারপর কোনটি; তবেই সম্ভব সত্যিকারের মুসলিম হিসেবে দুনিয়া এবং আখেরাতের সাফল্য অর্জন। যদিও আল্লাহ জানিয়ে দিয়েছেন: “কেউ দুনিয়ার পুরস্কার চাইলে তবে আল্লাহর কাছে দুনিয়া ও আখেরাতের পুরস্কার রয়েছে।” [নিসা: ১৩৪] তাই প্রকৃত মুমিনের জন্য দুনিয়া ও আখেরাত আলাদা আলাদা করার তেমন সুযোগ নেই। কেননা, তা তার ইবাদাতের জন্য সৃষ্টির উদ্দেশ্যের সাথে সাংঘর্ষিক। আল্লাহ্ আমাদের প্রকৃত মুমিন করুন।

৯ জুন ২০০৮, মদীনা মুনাওয়ারা, সউদী আরব।

Share