ছোটবেলায় যখন বৈশাখ আসি আসি করত, যখন মুকুল থেকে বেরিয়ে সবুজ রঙে দানা বাঁধতে শুরু করত আম, বসন্ত বিদায় নিতে শুরু করত; তখন দু’টি বাধার কথা গুরুজনদের কাছে শুনতে পেতাম। এক. ছোট ছোট কচি আমগুলো খেয়ো না, খেলে পেটে অসুখ হবে। দুই. কালি পূজোর বৈশাখী মেলায় যাবে না। কে না জানে এমন কথা? এ প্রজন্মের সকলেই এ বিষয়ে ওয়াকিফহাল। কিন্তু কি থেকে কি হয়ে গেল, মাত্র কয়েক বছরে পাল্টে গেল এদেশের ঐতিহ্য। জন্ম নিল(বলতে হবে জন্ম দেয়া হলো) নতুন ঐতিহ্য! বৈশাখী মেলা, মঙ্গল যাত্রা, মঙ্গল প্রদীপ জ্বালানো, মুখোশ পরা ইত্যাদি ইত্যাদি।
গাছটি মূলত একটি বিশাল আকারের পুরোনো অশত্থ গাছ। তবে অত্র এলাকার হিন্দু সম্প্রদায় গাছটিকে ডাকে কালি গাছ বলে। কালির হাট নামটি বোধ হয় কালি গাছটিকে কেন্দ্র করে হয়েছে। কেননা, প্রতি বাংলা বছরের প্রথম দিন কালি গাছের গুড়িতে এসে হিন্দু সম্প্রদায় পূজো করে ও নানা প্রকার ভোগ দিয়ে যায়। বাতাসা ছিটায় এবং এ উপলক্ষে তারা একটি আনন্দ দিন উদযাপন করে থাকে। এটা তাদের ধর্মরীতি। কালির হাটের কিংবদন্তী কি জানি কি, তবে অত্র এলাকার হিন্দুরা বৈশাখের প্রথম দিনে সূর্যোদয়ের আগে থেকেই কালি গাছের তলায় সমবেত হয়ে পেটাতে থাকে ঢোল, কাঁসা ইত্যাদি। তারপর দলে দলে হিন্দু মেয়েরা বাসন্তী রঙ শাড়ী পরে কুলোয় ভরা বাতাসা, ফলমূলের ভোগ, দুধ ও ফুল নিয়ে আসতে থাকে। তাদের সাথে সাথে ঢোল পেটাতে পেটাতে পুরুষরাও আসতে থাকে কালি তলায়। উৎসুক মুসলমানেরা উঁকি দিত তাদের এ আয়োজনে। আর এটিকে কেন্দ্র করে কিছু দোকানী তাদের ব্যবসার পসরা সাজিয়ে বসত। বাদ পড়ত না জুয়াড়ীরাও। জুয়ার আসরকে কেন্দ্র করে প্রায় প্রতি বছরই চলত ধুমধাম মারপিট। হিন্দু সম্প্রদায় তাদের আয়োজনে যা কিছুই করতো তাতে কেউ বাধা সৃষ্টি করত না। তবে মুসলমানগণ তাদের সন্তানদেরকে হিন্দুদের পূজোয় যেতে অনুৎসাহিত করত এবং বিশেষ করে পূজো উপলক্ষে আয়োজিত মেলায় জুয়ার যে আড্ডা বসত তা থেকে বিশেষভাবে ফিরিয়ে রাখতে চেষ্টা করত। সর্বোপরি পহেলা বৈশাখের মঙ্গল প্রদীপ জ্বালানো, ঢোল-শাঁখা পেটানো, বাসন্তী রঙ শাড়ী পরে মেয়েরা এবং ঢাক-ঢোল পিটিয়ে ও মুখোশ পরে মঙ্গল শোভাযাত্রা করা ইত্যাদি সবকিছুই তখন সর্বসম্মতিক্রমে ছিল হিন্দুদের কালিপূজার অংশ।

কিন্তু কি হয়ে গেল মাত্র দশক কালের ব্যবধানে কালিপূজোর আয়োজন হয়ে গেল বাঙালীর ঐতিহ্য?

এবারের পহেলা বৈশাখের আয়োজন দেখে কারো পক্ষে একথা ভাবতে কষ্ট হবে যে, মুসলমান অধ্যূষিত একটি দেশে বর্ষবরণের জন্য হিন্দু সম্প্রদায়ের কালিপূজো পালিত হচ্ছে! অনেকের কাছে অনেক রূপে বিবেচিত হতে পারে, তবে যাই হোক না কেন, একথা কোনক্রমেই অস্বীকার করা যাবে না যে, এসব আয়োজন নিছক কোন আয়োজন নয়; বরং একটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের সংস্কৃতিকে সমূলে উৎখাত করে তদস্থলে ঐতিহ্য ও জাতীয়তাবোধের নামে হিন্দু সংস্কৃতির প্রচলন ঘটানো। টিভি চ্যানেলগুলো দেখতে গিয়ে আজ কখনো মনে হলো এ যেন হিন্দুদের কোন পূজার শোভা যাত্রা, মুখোশে মুখোশে ঢাকা নৃত্য দেখে মনে হচ্ছিল যেন কোন ভূতুড়ে দেশ, আর দিকে দিকে “হে বৈশাখ!” “হে বৈশাখ!” ধ্বনি শুনে মনে হচ্ছিল যেন বৈশাখ কোন বিধাতা, যার কাছে প্রার্থনা করা হচ্ছে!!! শ্রদ্ধায়, অবনতচিত্তে, সুরে ও স্বরে; ঠিক যেভাবে হিন্দু সম্প্রদায় তাদের দেবতাদের পূজো করে ও প্রার্থনা করে।

হায়! আল্লাহকে না ডেকে বৈশাখকে ডাকা হলো পহেলা বৈশাখের সারাদিন। বৈশাখ তার প্রতিদান দিল কাল বৈশাখী ঝড় হয়ে এসে পাঁচটি প্রাণ ও বহু আহত করে, বহু ঘরবাড়ী ধ্বংস করে!

পহেলা বৈশাখ! বাংলা বছরের প্রথম দিন। অনেক চ্যানেলে দেখা গেল নানা সম্প্রদায়ের লোক ও তাদের উপাশনালয়ে কি কি হচ্ছে সেসব নিয়ে পথ সাক্ষাৎকার নেয়া হল। অথচ কোথাও দেখা মেলেনি কোন মুসলমান আলেমের যিনি বছরের প্রথম দিনের করণীয় জানাবেন। কেন এমন হলো? সাংস্কৃতিক সংগঠনের নামে বিভিন্ন নাস্তিক সংস্থাগুলোর কাছে যেন এদেশের সরকার পৃথিবীর একটি বিশাল সংখ্যক মুসলিম অধ্যূষিত এ দেশটির সংস্কৃতিকে বর্গা দিয়ে রেখেছে। ইসলামের গভীর জ্ঞান সম্পর্কে অজ্ঞ বিশাল মুসলিম যুব সম্প্রদায় আজ তাদের কাছে জিম্মি হয়ে আছে। এমনকি ইসলামী জ্ঞান রাখে, এমন পর্যায়ের যুবকেরাও ঝুঁকে পড়ছে নিছক আনন্দ উৎসবের দোহাই দিয়ে। অথচ কত পরিবর্তন মাত্র দশক কালের ব্যবধানে!

বহুদিন লিখিনা। কারণ জানিনা, খুঁজে দেখিনি। ভাল লাগলে লিখি, না লাগলে লিখি না, প্রয়োজন হলে লিখি, আলসেমি ঝেঁকে বসলে লিখিনা। কারণ, আমি আদতেই লিখিয়ে নই। তাই হয়ত। এ লেখাটি হওয়া উচিত ছিল অনেক দলীল প্রমাণ ভিত্তিক। যেহেতু লিখছি না অনেকদিন, তাই হয়ে উঠছে না আজ আর।

নববর্ষে কি করা উচিত তা পূর্বে পোষ্ট করা একটি খোৎবা/বক্তৃতায় মোটামুটি বিবৃত হয়েছে। বক্তব্যটি মসজিদুন্ নববীর ইমাম আব্দুল মুহসিন আল-কাসেম। লিংক যথাক্রমে-
১. নব বর্ষের শুরুতে স্বীয় আত্মার সাথে কিছু বুঝা পড়া: আব্দুল মুহসিন আল-কাসেম

২. নব বর্ষের শুরুতে স্বীয় আত্মার সাথে কিছু বুঝা পড়া: আব্দুল মুহসিন আল-কাসেম

১৫ এপ্রিল ২০১০, মদীনা মুনাওয়ারা, সউদি আরব।

Share