দীর্ঘ নয় বছর শাসন ক্ষমতা জবরদখল করে বাংলাদেশে স্বৈর শাসন চালিয়েছিলেন সাবেক প্রসিডেন্ট হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। গণমানুষের মুখের প্রতিবাদ, হাতের কলম ও চিন্তার প্রকাশের পথ রুদ্ধ করে রেখেছিল বন্দুকের নল উঁচিয়ে। কিন্তু কতদিন? না, দশ বছর হতে দেয়নি বাংলাদেশের বিপ্লবী ছাত্রজনতা। জীবন দিয়েছেন নূর হোসেনসহ আরো অনেকে, আহত হয়েছেন বহু নাগরিক, দেশ দিয়েছিল চরম মূল্য। আমরা ভুলে যেতে পারি, কখনো প্রাকৃতিক নিয়মে, কখনো রাতের আঁধারে বাস্তবায়িত কালো চুক্তিতে, কখনো ক্ষমতার মোহে, আবার কখনো বা নিজেদের অধঃপতনের কারণে। হাঁ, যদি পরিবর্তন দেখা যেত, যদি উন্নতি দেখা যেত একদার সামরিক জ্যান্তা ও স্বৈরাচারীর অবস্থানে, আচরণে, তবে কল্যাণ থাকতো ভুলে যাওয়ায়, এই মেনে নেয়ায়। কিন্তু এদেশে তো ‘দেশপ্রেম’ এখন বক্তৃতার ভাষা, যা মুখ থেকে দাঁত-ঠোঁটের ফাঁকফোঁকর থেকে ছিটকে বেরিয়ে আসে; অন্তর ছিঁড়ে তন্ন তন্ন করে খুঁজলে সত্যিকার দেশপ্রেমের ছিঁটে ফোটাও খুঁজে পাওয়া যাবে কি না সন্দেহ। তারই প্রকৃষ্ট নজির আমরা দেখতে পাই এবারের নির্বাচনের জোট-মহাজোটে।
গণতন্ত্রের মুক্তি দিবসে নূর হোসেনের মা জড়িয়ে ধরে শেখ হাসিনাকে অনুরোধ করেছিলেন যেন তার সন্তান হত্যাকারী স্বৈরাচারী এরশাদকে জোটে না নেন, কিন্তু নেত্রী সন্তান হারা মায়ের সে অনুরোধ রাখতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। মহাজোটের কাঁধে ভর করে লম্প দিয়ে আবারো সিংহাসনে জম্প দেয়ার প্রসঙ্গে এরশাদের ভাষ্য-
“সেদিনের লিখিত চুক্তিতে ক্ষমতায় যেতে পারলে আমাকে রাষ্ট্রপতি পদ দেয়ার অঙ্গীকারও ছিল। আমি মনে করি এবারো মহঐক্যজোটের মাধ্যমে নির্বাচন হলে এবং সরকার গঠন করতে পারলে আমাকে অবশ্যই রাষ্ট্রপতি করা হবে। কারণ আমি রাষ্ট্রপতি ছিলাম। এখন ক্ষমতায় গেলে আমি তো মন্ত্রী, এমপি হতে পারি না। আমাকে রাষ্ট্রপতিই হতে হবে।”
সূত্র: খবর ডট কম।
এরশাদ আরো জানান- তাকে রাষ্ট্রপতি করা হলেও ভালো, না করা হলেও ভালো। তবে ২০০৬ সালের মহাজোট গঠনের সময়, ক্ষমতায় গেলে তাকেই রাষ্ট্রপতি বানানো হতো সেরকম একটি চুক্তি হয়েছিল বলে তিনি আবারো দাবি করেন। এরশাদ বলেন, “এবার চুক্তি না হলেও তাকেই যে রাষ্ট্রপতি করা হচ্ছে এ ব্যাপারে তিনি দারুণ আশাবাদী।”
সূত্র: দৈনিক নয়াদিগন্ত।
পরন্তু এরশাদের অস্থিতিশীল অবস্থান ও বক্তব্য দারুন হাস্যকর হিসেবে দেশবাসীর নিকট প্রমাণিত হয়ে আসছে বিগত কয়েকমাস থেকে। দেশের মানুষ এখন একথা ভেবে আশ্চর্য হচ্ছে যে, এরূপ অস্থিরচিত্ত একজন মানুষ কি করে দীর্ঘ নয় বছর তাদের উপর শাসন(স্বৈরশাসন) পরিচালনা করে এসেছিল। বিগত কয়েক মাসে বেশ ক’বার শোনা গিয়েছিল যে, এরশাদ মহাজোটে নেই, আবার শোনা যায় আছেন, আবার নেই, আবার আছেন। যার সর্বশেষ সংস্করণ দেশবাসী দেখেছে গতকাল। মাত্র পনর ঘন্টার ব্যবধানে চূড়ান্ত ঘোষনা দেয়ার পরও দারুন পিচ্ছিল চরিত্র বিশিষ্ট এরশাদ ও তার দল জাতীয় পার্টি যে উলঙ্গ অস্থিরতা দেখালেন, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে তার নজির বিরল।
সংবাদ মাধ্যমগুলো দেশবাসীকে জানায় যে, দৃশ্যত ক্ষুব্ধ এরশাদ সাংবাদিকদের বলেন, “জাতীয় পার্টি আর মহাজোটে নেই। আওয়ামী লীগ এখন যদি আমাদের ৭০ বা ৮০টি আসনও সাধে তাও আমরা মহাজোটে ফিরে যাবো না।”
“মহাজোট থেকে বেরিয়ে আসার ব্যাপারে আমরা আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছি। এর আগে আসন ভাগাভাগি নিয়ে আলোচনায় আমরা বুঝতে পেরেছিলাম যে আওয়ামী লীগও চায় না জাতীয় পার্টি মহাজোটে থাকুক।”
শুধু ব্যক্তি এরশাদই নয়; বরং দলের প্রেসিডিয়াম সদস্যের অন্যতম একজন কাজী জাফর আহমেদ বলেন, “আমরা মহাজোটে থাকছি না। এব্যাপারে (প্রেসিডিয়াম বৈঠকে) সিদ্ধান্ত হয়েছে।”
প্রেস ব্রিফিং এ কাজী জাফর বলেন, “প্রেসিডিয়াম সদস্যদের মতামতের ভিত্তিতে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়েছে। আমরা আর মহাজোটে নেই। ৪১টি কেন ১০১ টি আসন দিলেও মহাজোট আর জোড়া লাগবে না। তাদের আর বিশ্বাস করা যায় না।”
সূত্র: বিডি নিউজ২৪ ডট কম।
অথচ দেখুন কত সামান্য সময়ের ব্যবধানে কি পরিমাণ চূড়ান্ত ঘোষণা দেয়ার পর এরশাদ আবারো ফিরে যাচ্ছেন বর্জন করা জোটে। সংবাদে বলা হয়-
“বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ১১ টার দিকে এরশাদ বলেছেন, “মহাজোট এখনো ভাঙ্গে নাই। বিকাল ৫টা নাগাদ তারা প্রার্থী প্রত্যাহার করলে আমরা মহাজোটের সঙ্গে নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত আছি। ”
সূত্র: বিডি নিউজ২৪ ডট কম।
এর দ্বারা কি দেশবাসীর জন্য আরো কিছু বুঝার আছে যে, তাদের ভবিষ্যত কর্ণধার হিসেবে এরশাদ কতটা অযোগ্য? কে জানে, আল্লাহ্ না করুন যদি এরশাদের মত ব্যক্তিরা আবারো ক্ষমতায় যেতে পারেন, তবে এরূপ অস্থির চিত্ততার কারণে কখন ভুল করে দেশটাকে বিক্রয় করে দিয়ে আসেন কোন বিদেশী সরকারের সুস্বাদু খাবারের টেবিলে কিংবা রাত্রিকালীন কোন লোভনীয় সুন্দরীর মোহে।
মহাজোট বার বার ত্যাগ করা ও বার বার ফিরে ফিরে আসা এরশাদ ‘মহাজোট’ সম্পর্কে বলেন- “মহাজোটের কথা আমিই আগে বলেছি। লন্ডনে আমাদের প্রতিনিধি শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করেছেন। উনি মহাজোটের কথা বলেছিলেন। আমি দেশে ফিরে মহাজোটের কথা বার বার বলেছি। এ মহাজোটের কথা বলার পর আওয়ামী লীগের অনেক নেতৃস্তরের ব্যক্তি আমাকে পরিহাস করেছেন, কটুক্তি করেছেন। এটা আপনারা সব জানেন। আমি এসব সহ্য করেছি।” এবং জোটের প্রধান দল একদার স্বৈরাচারী এরশাদের পতন আন্দোলনের শরীক আওয়ামী লীগকে দায়ী করে এরশাদ আরো বলেন- “ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ আওয়ামী লীগের অফিসে গিয়ে ৯ ঘণ্টা বসে ছিলেন; কেউ তার সঙ্গে দেখা করেননি। আমাদের প্রতি অনেক অবহেলা করা হয়েছে, অসম্মান করা হয়েছে। তা সত্ত্বেও বার বার বলেছি আমরা মহাজোটে আছি।”
সূত্র: বিডি নিউজ২৪ ডট কম।
দেশ ও জাতির কল্যাণ নিয়ে সাবেক স্বৈরাচারী প্রেসিডেন্ট এরশাদের তেমন কোন মাথাব্যাথা লক্ষ্য করেনি দেশবাসী। বরং বিশেষভাবে লক্ষ্য করেছে এরশাদের ‘জীবনের আরেকবার প্রেসিডেন্ট হবার খায়েশ’-এর কথা। এত কিছুর পরও জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট থাকার কি নির্লজ্জ অভিলাষ! রাজনৈতিক দলগুলো ও সেসবের নেতৃবৃন্দের ব্যক্তিগত স্বার্থ-ক্ষোভ-উচ্চাভিলাষের কাছে প্রতি বছর অসংখ্য নাগরিক বলি হচ্ছে যেখানে, হরতাল-অবরোধে দেশের কোটি কোটি টাকার সম্পদ নষ্ট হচ্ছে যে দেশে, সেদেশটিকে দীর্ঘ নয় বছর শাসন করা একজন প্রেসিডেন্টের নির্বাচনে অংশ নেয়ার ক্ষেত্রে যেন এই একটি মাত্র উদ্দেশ্য যে, তিনি হবেন পরবর্তী সরকারের প্রেসিডেন্ট! কি নির্মম রসিকতা এদেশের মানুষেরা সহ্য করে যাচ্ছে নিরবে, মুখবুঁজে। সংবাদ মাধ্যমে আমরা যার পর্যালোচনা পাই এভাবে-
এরশাদ সাহেব নিজেই বলেছেন, সংসদীয় পদ্ধতিতে প্রেসিডেন্টের কোনও ক্ষমতা নেই। তবে এটা মানসম্মান ও মর্যাদার ব্যাপার। তাই তিনি শেষ বয়সে বঙ্গভবনে থাকতে চান। প্রেসিডেন্টের মহামান্য আসনটি অলংকৃত করতে তার বড় ইচ্ছে। কিন্তু প্রেসিডেন্ট হবার জন্য তার মনের ভেতর আকুলিবিকুলি করলেও কিংবা শেখ হাসিনার সঙ্গে লিখিত চুক্তি থাকলেও এরশাদ সাহেবের প্রেসিডেন্ট হবার জো নেই। দেশের সংবিধান সেপথ রুদ্ধ করে দিয়েছে। হ্যাঁ, তিনি যদি আবার দেশের প্রেসিডেন্টপদটি অলংকৃত করতে চান তাহলে বাংলাদেশের সংবিধান সংশোধন করতে হবে। আর এজন্য প্রয়োজন হবে দু’শতাধিক সংসদ সদস্যের ভোট।
উল্লেখ্য, দেশে প্রেসিডেন্ট পদ্ধতির শাসন পরিবর্তন করে সংসদীয় শাসনব্যবস্থার পুনঃপ্রবর্তনের সময়েই এরশাদ সাহেবের ভবিষ্যত প্রেসিডেন্ট হবার পথ রুদ্ধ হয়ে যায়। সেসময় সংবিধানের চতুর্থভাগে প্রেসিডেন্ট সম্পর্কিত পরিচ্ছদটিই বদলে ফেলা হয়। এরশাদের প্রেসিডেন্ট হবার পথে বাধাটি রয়েছে এখানেই। এর ৫০(২) অনুচ্ছেদে আছে, “No person shall hold office as President for more than two terms, whether or not the terms are consecutive.” -Constitution of the People’s Republic of Bangladesh অর্থাৎ ‘একাদিকক্রমে হউক বা না হউক-দুই মেয়াদের অধিক রাষ্ট্রপতির পদে কোন ব্যক্তি অধিষ্ঠিত থকিবেন না।’ সংবিধানের এই বিধান উপেক্ষা করতে গেলে বিপত্তি সৃষ্টি হবে। এর নিস্পত্তি না হওয়া অবধি কোনও ‘চুক্তি’ কিংবা ‘সমঝোতা’র মাধ্যমে এরশাদকে প্রেসিডেন্টের পদে বসানো যাবে না।
সূত্র: দৈনিক সংগ্রাম।
সবশেষে ‘আমাদের সময়’-এ প্রকাশিত আকিদুল ইসলামের লেখা থেকে নিম্নোদ্ধৃত অংশটুকু যোগ করছি, এতে দেশপ্রমিক মানুষেরা অনেক অমিল-সমিল খুঁজে দেখতে পারবেন এ লেখায় আলোচিত একজন ‘বাংলাদেশের ভবিষ্যত প্রসিডেন্ট হবার স্বপ্নদ্রষ্টা’র কার্যক্রমে। তবে বিশেষ শিক্ষা নিহিত রয়েছে ‘দেশ-প্রেমের ফেরিওয়ালা সেক্টর কমান্ডার্স ফোরাম’ এর জন্যে।
“৭১-এর ২৫ মার্চ যখন পাকসেনারা বাঙালির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তখন হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ রংপুরে ছুটি কাটাচ্ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধে যোগ না দিয়ে এপ্রিলে তিনি পশ্চিম পাকিস্তানে গিয়ে সপ্তম ইস্ট বেঙ্গলের অধিনায়ক হিসেবে যোগদান করেন। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে অসুস্থ পিতাকে দেখার জন্য সেপ্টেম্বরে রংপুরে আসেন। এবারো স্বাধীনতা সংগ্রামে যোগ না নিয়ে ফিরে যান পাকিস্তানে। ১৯৭২ সালে পাকিস্তানে আটকেপড়া বাঙালি অফিসার ও সৈন্যদের ‘দেশদ্রোহিতা’র অপরাধে বিচার শুরু হলে লে• কর্নেল এরশাদকে ট্রাইবুনালের চেয়ারম্যান নিযুক্ত করা হয়। ভাবতে পারেন? ভুট্টো বাংলাদেশ থেকে ফিরে যাওয়া ৯৮ হাজার পাক যুদ্ধবন্দির একজনকেও সেনাবাহিনীতে বহাল রাখেননি। অথচ যিনি পাকিস্তানে বসে বাঙালি সেনা অফিসারদের বিচার করছিলেন তিনি হয়ে গেলেন বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর প্রধান! এর প্রায়শ্চিত্ত জাতিকে করতে হবে না?”
সূত্র: আমাদের সময়।
দেশবাসীকে চিন্তা করতে হবে, একথা বুঝতে হবে যে, ১৪ দলীয় মহাজোট বিজয়ী হলে এরশাদের মত ব্যক্তিদের আবারো প্রেসিডেন্ট হবার সুযোগ সৃষ্টি হবে। পরন্তু যারা রাজাকার প্রার্থী দিয়ে, (বাংলানিউজ আর্কাইভ) এরশাদের মত ‘৭১ এ মুক্তিযুদ্ধে যোগ না দিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানে গিয়ে সপ্তম ইস্ট বেঙ্গলের অধিনায়ক হিসেবে যোগদানকারী (এক প্রকারের রাজাকার)’ ও নিজেদেরই সংগ্রামে নিপাত করা একদার স্বৈরাচারের সাথে আঁতাত করে ক্ষমতার মসনদে আরোহণের প্রচেষ্টা চালাচ্ছে এবং অন্যদিকে তারাই আবার মীমাংসিত যুদ্ধাপরাধী ইস্যূকে সামনে রেখে ও ‘রাজাকার’ ‘আলবদর’ বলে চিৎকার করে করে মুখে ফেনা তুলে তাদের দ্বিমুখী চরিত্রকে গণমানুষের সামনে উলঙ্গ করে দিচ্ছে। সুতরাং দেশবাসীদের এদেরকে চিনতে হবে। মূলতঃ এসবের মাধ্যমে যারা বাংলাদেশের ৮৫ ভাগ মানুষের ঈমান-আকীদাকে মুছে দেয়ার গভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত তাদেরকে প্রতিহত করাই এবারের নির্বাচনে উক্ত ৮৫ ভাগ মুসলমানের ঈমানী দায়িত্ব। অন্যথা এর দায়ভার তাদেরকেই বহন করতে হবে। আল্লাহ্ হেফাযত করুন বাংলাদেশকে এসব ভয়ংকর নেতৃত্বের মহামারী থেকে।
১১ ডিসেম্বর ২০০৮, মদীনা মুনাওয়ারা, সউদী আরব।


০ জন অতিথি মতামত দিয়েছেন " স্বৈরাচারী ও স্থিতিতে পিচ্ছিল এরশাদকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে আবারো সহ্য হবে? " লেখাটিতে
comment rss যুক্ত করুন অথবা Trackback করুন।লেখাটি সম্পর্কে মতামত রাখুন