জন্মের পরপরই শুরু হয় আমাদের খেলাধুলার জীবন। আপন মনে দু’হাত আর দু’টি পা উপরে তুলে চলতে থাকে ছুঁড়োছুঁড়ি খেলা। যতক্ষণ না পেটের দুধটুকু ফুরিয়ে যায়, ততক্ষণ কি মজা করেই না চলতো আঙ্গুল খাওয়ার সাথে সাথে পৃথিবীকে দেখা আর হাতের কাছে পাওয়া জামার রশি ছেঁড়ার প্রয়াস। ক্ষুদা লাগলে কি আর খেলতে ভাল লাগে? জানানোর মত ভাষা যে তখনো রপ্ত হয়নি, কি আর করা, জুড়ে দাও চিৎকার ৎৎৎৎৎৎৎৎৎ।

দিন বদলের পালায় আর পালা বদলের হাওয়ায় হেলতে দুলতে যখন পুতুল খেলার দিন বরাবর এলাম, তখন নানাবাড়ীর চৌচালা কুঁড়ে ঘরের পিছনের ধুঁদুল, সীম আর টমেটোর গাছের ফাঁক ফোঁকরে ঝিঙ্গে ফুলও শোভা পেত। মেঝেখালা বেড়াতে এলেই পড়তো আনন্দের ধুম, মোট মিলিয়ে পিচ্ছিদের আদমশুমারীটা ভরে উঠতো তখন, সব পিচ্ছিরা মিলে মিছেমিছি রান্নাবান্নার কাজে সে কি ব্যস্তসময়। বড় মাকড়সার মত এক ধরনের পোকাকে আমাদের খুব ভাল লাগতো, ওরা চার কি ছয়টি হাতপা দিয়ে ব্যায়াম কিংবা নাচার এক ধরনের স্টাইলে বিরতিহীনভাবে লাফাতে থাকতো; পা কিন্তু মোটেই নড়তো না। আমরা ডাকতাম ‘গান গাওয়া পোকা’ যদিও কোনরূপ শব্দাবলী বেরুতা না, ওদেরকে অনেক যত্ন করে নিজের বলে পাহারা দিতাম। আর ছিল পান পাতার মত ক্ষুদ্রাকৃতির পাতা, যাকে আমরা বলতাম ‘পিঠা গাছ’, তা থেকেই আমাদের মেহমানদারী হয়ে যেত মিছেমিছি। বৃষ্টি আর বজ্রের সাথে পুকুরে দাপাদাপিটাও ছিল অদ্ভুত আনন্দের খেলা।

দেখতে দেখতে বেশ বড় হয়ে উঠেছিলাম। আহা, কি যে প্রিয় ছিল তখনকার খেজুরের বিচি দিয়ে দশটা গর্ত করে চালাচালি খেলা (আমরা বলতাম “খাজুরের গুডি খেলা”), এটা চলতো খেজুরের মৌসুমে শুধু। শীতের খেলাধুলার মধ্যে আরো ছিল ডান্ডা-গুলি, কানামাছি, বৌচি’র বৌদের সাথে আমরা ‘জামাই’রাও খেলতাম, আরো ছিল কুতকুত, গোল্লাছুট, ফড়িং ধরা আর জোনাকী পোকা ধরে বোতলে ভরে প্রাকৃতিক টর্চ লাইট তৈরী, অবশ্য ঘুমোনোর আগে ডিম লাইট হিসেবেও দারুন কার্যকর ছিল; মন খারাপ হতো দু’একদিন পর তাদের ব্যাটারীর চার্জ চলে গেলে মানে ওরা মরে গেলে। বর্ষাটা ছিল খেলাধুলার জন্য খুবই অপ্রিয় মৌসুম। উঠোন জুড়ে কাদায় কাদায় গাদাগাদি, কিন্তু হলে কি হবে, সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলতাম তাৎক্ষণিক, পানি জমে উঠা ভিটেগুলোকে বানিয়ে ফেলতাম মাঠ আর হাওয়া থাকে না এমন টাইপ ফুটবল নিয়ে শুরু হতো আমাদের কাদার রাজ্যে বিশ্বকাপ জয়ের লড়াই। কৌশল থোরাই কেয়ার করি, কে কত জোরে শর্ট-লাথি দিতে পারি বলে, সেটাই ছিল ভাল খেলোয়াড়ের পরিচয়।

এসব কিছুকে পাশ কাটিয়ে আজো মনের কোণে উঁকি দেয় সীমবীচি, চাউল, কুমড়ার দানা, হেলেন সীম (আঞ্চলিকতায় ডাকা, ভাল নাম জানা নেই) আর চাউলের গুঁড়া তৈরীতে অবশিষ্ট কণা চাউল দিয়ে বানানো ‘বুদরা’ পিঠা। সাথে জমতো ১০০/২০০ খেলা। তাসকে কেন যেন ছোট বেলা থেকেই অপছন্দ করতাম, তাই আজো শেখা হয়ে উঠেনি, আর শিখতেও চাই না। দাবায় ছিলাম এলাকা প্রসিদ্ধ দাবাড়ু। ক্রিকেটের কথা না হয় অন্য কখনোই বলি? সত্যিই ছোট্ট বেলার সেকথা, কখনো কি ভুলতে পারি?
= = = =

Share